একটি সুস্থ, সুখী ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ মা ও সুস্থ শিশু ।
আর এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম প্রধান উপায় হলো প্রজননস্বাস্থ্য ও নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা । একজন নারী যেন কৈশোর থেকে শুরু করে গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং পরবর্তী সময় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য ও অধিকার পান এটাই প্রজননস্বাস্থ্য ও নিরাপদ মাতৃত্বের মূল উদ্দেশ্য ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাতৃমৃত্যুর অধিকাংশ কারণ প্রতিরোধযোগ্য । সচেতনতা, দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য মায়ের জীবন রক্ষা করা সম্ভব ।
প্রজননস্বাস্থ্য কী ?
প্রজননস্বাস্থ্য বলতে নারী ও পুরুষের প্রজনন অঙ্গের সুস্থতা, নিরাপদ যৌন ও প্রজনন জীবন, পরিবার পরিকল্পনা, নিরাপদ মাতৃত্ব, নবজাতকের যত্ন এবং প্রজনন-সংক্রান্ত রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাকে বোঝায় ।
প্রজননস্বাস্থ্যের মূল বিষয়গুলো হলো
কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য শিক্ষা
পরিবার পরিকল্পনা
নিরাপদ মাতৃত্ব
গর্ভকালীন সেবা
নিরাপদ প্রসব
প্রসব-পরবর্তী সেবা
নবজাতকের পরিচর্যা
যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা ও পরামর্শ |
নিরাপদ মাতৃত্ব কী ?
নিরাপদ মাতৃত্ব হলো এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে একজন নারী গর্ভধারণের আগে, গর্ভকালীন সময়ে, প্রসবের সময় এবং প্রসব পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারেন এবং নিজেও সুস্থ থাকেন ।
এটি প্রতিটি নারীর মৌলিক অধিকার ।
নিরাপদ মাতৃত্বের ৬টি স্তম্ভ
১. পরিবার পরিকল্পনা
২. গর্ভকালীন নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা (ANC)
৩. দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে নিরাপদ প্রসব
৪. জরুরি প্রসূতি সেবা (Emergency Obstetric Care)
৫. প্রসবপরবর্তী সেবা (PNC)
৬. নবজাতকের প্রয়োজনীয় সেবা
মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ
বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে
প্রসবকালীন জটিলতা
গর্ভকালীন জটিলতা
প্রসবপরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
গর্ভপাতজনিত জটিলতা
প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ
টিটেনাস ও অন্যান্য সংক্রমণ
এসবের অধিকাংশই সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব ।
প্রসবজনিত জটিলতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID)
রক্তস্বল্পতা
পেরিনিয়াম ছিঁড়ে যাওয়া
জরায়ু নেমে আসা (Genital Prolapse)
ভেসিকোভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা (VVF)
রেক্টোভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা (RVF)
বন্ধ্যাত্ব
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে করণীয়
সঠিক বয়সে বিয়ে করা ।
পরিকল্পিতভাবে সন্তান গ্রহণ করা ।
গর্ভধারণের পর দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিবন্ধন করা ।
নিয়মিত গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা ।
আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা ।
সকল প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করা ।
দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে প্রসব করানো ।
প্রসবের পর মা ও শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা ।
জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো ।
পরিবারের ভূমিকা
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে স্বামী, পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । গর্ভবতী মায়ের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, মানসিক সমর্থন এবং প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা পরিবারকেই নিশ্চিত করতে হবে ।
একজন প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকের দৃষ্টিভঙ্গি
গ্রামাঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক মা নিয়মিত গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন না বা দেরিতে হাসপাতালে যান । ফলে সামান্য একটি জটিলতাও বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । অথচ সময়মতো পরামর্শ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে প্রসব হলে অধিকাংশ ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব ।
প্রজননস্বাস্থ্য ও নিরাপদ মাতৃত্ব শুধু স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নয় এটি নারীর অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি । সুস্থ মা মানেই সুস্থ শিশু, আর সুস্থ শিশু মানেই একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ । তাই আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই, পরিবারকে সচেতন করি এবং প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করি ।
"নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি সুস্থ মা, সুস্থ শিশু, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি ।"
লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (Nutrition & Health) পল্লী শিশু ফাউন্ডেশন হতে মা ও শিশু স্বাস্থ্যে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও এসএমসির ব্লু স্টার স্বাস্থ্য সেবা দানকারী।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.