ফুটবল ইতিহাসে অনেক নায়ক এসেছেন, চলেও গেছেন সময়ের স্রোতে। কিন্তু একজন মানুষ যেন সেই স্রোতকে বারবার থামিয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, বয়স কেবলই একটি সংখ্যা, প্রতিভার কোনো মেয়াদ নেই।
লিওনেল মেসি ফুটবল ইতিহাসের বিরল কীর্তি লিখে দিলেন ৩৯ বছর বয়সে একের পর রেকর্ডের পাতা নতুন করে লিখে। গল্পের শেষটা হতে পারত বিশ্বকাপ শিরোপা দিয়ে। কিন্তু স্পেনের মায়াবী ফুটবলের সামনে রানার্সআপ মুকুটে বিশ্বকাপ মঞ্চ ছাড়তে হলো তাদের।
২০১৪ সালে ব্রাজিলে আর ২০২২ সালে কাতারে—দুবার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেয়েছেন। এবারের আসরেও রেসে ছিলেন শক্তভাবেই। শেষ পর্যন্ত স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক রদ্রির হাতে উঠেছে সেরার মুকুট। গোল্ডেন বলের ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া ফাইনাল শুরুর আগেই শেষ হয়ে যায়, তাই এই পুরস্কার সবসময় চ্যাম্পিয়ন দলের ঘরেই যায় না। ২০০৬ সালে জিনেদিন জিদান, ২০১৮ সালে লুকা মদ্রিচ এবং ২০১৪ সালে মেসি নিজেও রানার্সআপ হয়েও এই মুকুট পরেছিলেন। ১৯৭৮ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কার অনেক সময় এমন খেলোয়াড়ও জিতেছেন, যাদের দল বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। একমাত্র গোলরক্ষক হিসেবে অলিভার কান জিতেছিলেন ২০০২ সালের পুরস্কার।
এবারের আসরে পরিসংখ্যান কথা বলছিল মেসির হয়ে। ফাইনালের আগ পর্যন্ত রোজারিওর ফুটবল বিস্ময়ের নামের পাশে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট লেখা ছিল। ৩৯ বছর বয়সে এসে এমন ধারাবাহিকতা রূপকথাকেই হার মানায়। এই যাত্রা অবশ্য সোজা পথে হাঁটেনি। ২০১৪ সালে ফাইনালের এত কাছে গিয়েও শিরোপা হাতছোঁয়া দূরত্বে থমকে যাওয়া, ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে পেনাল্টি মিস—একবুক অভিমানে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা। সব মিলিয়ে গল্পটা ছিল হারিয়ে যাওয়ার নয়, বরং বারবার ফিরে আসার। সেই ফেরার পথ ধরেই এসেছে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আর ২০২৪ সালের আরেকটি কোপা আমেরিকা শিরোপা।
প্রতিপক্ষ শিবিরও অবশ্য মুখর দাবিদারে ভরা। স্পেনের উনিশ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল এই আসরে যেভাবে নিজের ছাপ রেখেছেন, তাতে ভবিষ্যতের প্রতিনিধি হিসেবে তার নামও উঠে আসছে জোরালোভাবে। আবার স্পেনের আক্রমণে নিঃশব্দ নায়ক মিকেল ওইয়ারসাবাল, যিনি ২০২৪ সালের ইউরো ফাইনালেও জয়সূচক গোল করেছিলেন। এবারও দলের ফাইনাল যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। রিয়াল সোসিয়েদাদের এই ফরোয়ার্ড এবারের বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করেছেন দলকে ফাইনালে তুলতে।
বিশ্লেষকরা আগেই বলে দিয়েছিলেন, গোল্ডেন বুটের দৌড়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও গোল্ডেন বল জেতার প্রবল সম্ভাবনা মেসিরই—কখনো গোল করে, কখনো সতীর্থদের দিয়ে করিয়ে। অনেকের মতে এটাই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ। মেসির জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই শেষ বিশ্বকাপ, আর ২০৩০ সালের আসরে তার খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটা লিখে যেতে যা প্রয়োজন, তার সবকিছুই করে দেখিয়েছেন এবারের আসরে। কিন্তু ভাগ্য দেবতা শেষের গল্পটা লিখে রেখেছিল ভিন্নভাবে।
মেসির গল্পটা কখনোই কেবল জয়-পরাজয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছিল শৈশবের অসুখ থেকে ফিরে আসার মাধ্যমে, সমালোচনার আগুন নিভিয়ে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে, নিজের অভিমান জয় করার গল্প লিখে। এবারের মুকুটের দুয়ারে গিয়ে ফিরে আসার নাটকীয়তায়। প্রতিভা কখনো সংখ্যায় বন্দি থাকে না—সে বেঁচে থাকে মুহূর্তের ভেতর, দর্শকের চোখের বিস্ময়ে, আর ইতিহাসের পাতায় খোদাই হওয়া একটি নামের মধ্যে। মাঠের পাবলো পিকাসো যখন রংতুলি হাতে নামেন, তখন গোটা বিশ্ব তাকিয়ে থাকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে। ক্যারিয়ারজুড়ে মেসি ছিলেন পিকাসো, কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়াম লিখল এই তারকার হতাশার গল্প।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০২
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.