প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬ ০০:০০ (মঙ্গলবার)
চীনা ঋণেই হচ্ছে আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ লাইন

প্রথম থেকেই অর্থায়নের আগ্রহ ছিল চীনের। আলোচনা এগিয়েও মাঝপথে থামে ভারতের বাগড়ায়। সেখানেও হিসাব না মেলায় প্রকল্পই চলে যায় অন্ধকারে। এভাবে এক দশক কাটার পর চীন আবার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে আখাউড়া-সিলেট সেকশনের মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজ রেললাইনে রূপান্তর প্রকল্পে।

ঋণ জটিলতায় একপর্যায়ে প্রকল্পটি পুরোপুরি অনিশ্চয়তায় পড়ে। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেলমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনা সভায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি থেকে প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রকল্পটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।


ঋণ দিতে চীনের আগ্রহ
তবে নতুন করে প্রকল্পে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। এতে এক দশকের বেশি সময় পরে প্রকল্পটি নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চীন সরকারের অর্থায়নে জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি গ্রহণের বিষয়ে গত ২১ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে নীতিগত সম্মতি জ্ঞাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত দিয়েছে মন্ত্রিসভা।


এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার চীনা দূতাবাসের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কনস্যুলার বরাবর এ সংক্রান্ত চিঠি দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।


অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নে রেলভিত্তিক আঞ্চলিক যোগাযোগ স্থাপন এবং রেলওয়ের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোয় অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাংলাদেশ। এজন্য বাংলাদেশ সরকার আখাউড়া-সিলেট রেলপথটি মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরে আগ্রহী।


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরাসরি চীনের ঠিকাদার নিয়োগে সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এজন্য অনুমোদন করা হয়েছে প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাবনা (পিডিপিপি)।


পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনার প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি পুনরায় এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’


ডুয়েলগেজে রূপান্তর হবে ২৩৯ কিমি লাইন
রেলপথ মন্ত্রণালয় জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে উন্নীত করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ‘আখাউড়া-সিলেট সেকশনের মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজ রেললাইনে রূপান্তর’ শীর্ষক এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটির জন্য চীনের কাছ থেকে প্রায় ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ১২৭ কোটি ২৯ লাখ ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে।


প্রকল্পের আওতায় ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। এর মধ্যে ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মূল রেলপথ ও ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন রয়েছে। এ রেলপথের ডিজাইন স্পিড ধরা হয়েছে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার।


প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। সারা দেশের সব রেলপথ পর্যায়ক্রমে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই অংশ হিসেবে সিলেটের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সংযোগ রেলপথ ডুয়েলগেজ করা হবে।


এরই মধ্যে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ অংশটি ট্রান্স-এশিয়ান রেল রুটের অন্তর্ভুক্ত। তবে কুলাউড়া থেকে আখাউড়া ও সিলেট পর্যন্ত রেলপথ এখনো মিটারগেজ। তাই সক্ষমতা বাড়াতে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর জরুরি।


চীন-ভারত উভয় দেশের আগ্রহ ছিল
প্রকল্পটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৬ সালে। তখন চীন অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে পরবর্তীসময়ে ভারত আগ্রহ দেখানোয় কিছুটা দোলাচল তৈরি হয়। ভারত তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইরকন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (ইরকন) মাধ্যমে কাজ পাওয়া সাপেক্ষে অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল।


সাবেক রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনকে লেখা একটি চিঠিতে ইরকন এ প্রস্তাব দেয়। চিঠিতে ইরকন জানায়, তারা ভারতের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ইচ্ছুক। তবে পরে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।



২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দসহ প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি শূন্য। প্রকল্পের অনুকূলে অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়া ও প্রকল্পের কাজ শুরু না করার কারণে তৎকালীন রেলমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এডিপি পর্যালোচনা সভায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি থেকে প্রকল্পটি বাদ দেওয়া হয়।


চীনা ঋণের নিশ্চয়তা মিলেছে
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) শেখ সাকিল উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অর্থায়নের অভাবে প্রকল্পটি এডিপি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে চীন থেকে অর্থায়নের নিশ্চয়তা মিলেছে। ফলে পুনরায় প্রকল্পটি এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।’


চীন কি পরিমাণে অর্থায়ন করবে? এ বিষয়ে শেখ সাকিল উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘একনেক সভায় অনুমোদনের পরে প্রকল্প ঋণ যা ধরা হয়েছে, এটাই দেবে। তবে চীনের সঙ্গে প্রকল্পের কিছু বিষয়ে নেগোসিয়েশন করা হবে। তাদেরও কিছু চাওয়া থাকবে, আমরাও দেশের প্রেক্ষাপটে সাশ্রয়ের বিষয়টি দেখবো।’


বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, চলতি বছরের জুন মাসে চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুদিনের ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তার জন্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়।



এর আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের ঋণ গ্রহণে আগ্রহী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে ঋণ প্রস্তাবের সঙ্গে পিডিপিপি, প্রাথমিক পরিবেশগত পরীক্ষা (আইইই) প্রতিবেদন, পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদন ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন সংযোজন করা হয়েছে। এগুলো বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার বিষয়টি দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রস্তাব করা হয়।



ভারতীয় প্রস্তাব ও চীনের সঙ্গে নানামুখী আলোচনায় অন্ধকারে চলে যায় প্রকল্পটি। চীনকে যদি আর ফেরানো না যায়, সেক্ষেত্রে ভারত, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জাইকাকে বিকল্প উৎস ভেবে রেখেছিল সরকার।


তবে সবাইকে পেছনে ফেলে প্রকল্পে ফিরছে চীন। এ অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করতে কাজ করছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।


কিছু বিষয়ে আপত্তি পরিকল্পনা কমিশনের
পরিকল্পনা কমিশন থেকে জানা যায়, প্রকল্পে ব্যালাস্ট (পাথর), স্লিপার, রেলসহ বিভিন্ন উপকরণের পরিমাণ ও ব্যয় চলমান সমজাতীয় অন্য প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। সব মিলিয়ে প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় সমজাতীয় চারটি প্রকল্পের তুলনায় প্রায় সাতগুণ।


এত ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সমীচীন হবে না বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। ওই সময় প্রস্তাবিত প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা।


অন্যদিকে, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ ও বিদ্যমান রেললাইন ডুয়েল গেজে রূপান্তরে চলমান প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

কিলোমিটারপ্রতি ৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ঈশ্বরদী থেকে পাবনা ঢালারপর পর্যন্ত নতুন রেলপথ। এছাড়া মধুখালী থেকে কামারখালী হয়ে মাগুরা পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল আরেকটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণে ব্যয় মাত্র ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।


প্রকল্পের ভৌত কাজের জন্য প্রতিযোগিতা ছাড়া এক ঠিকাদারের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতেও পরিকল্পনা কমিশন আপত্তি জানিয়েছিল।


কমিশনের মতে, চীনের অন্য দরদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্যও দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতে হবে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু ওই প্রকল্পে অনেক বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত চীনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন বাতিলের সিদ্ধান্তও নিয়েছিল।


পরিকল্পনা কমিশন আরও বলেছিল, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডুয়েলগেজ লাইন হলে ট্রেন চলাচলের হার (ফ্রিকোয়েন্সি) বাড়বে না। এ রুটে ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ নির্মাণ করা হলে এ প্রকল্প থেকে সুবিধা পাওয়া যাবে না। সরকারের এ বিশাল বিনিয়োগে জনগণের তেমন কোনো সুবিধা হবে না।


তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও এ প্রকল্পে আপত্তি তুলে এক চিঠিতে বলেছিলেন, এটা ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ হওয়া উচিত। শুধু ডুয়েলগেজ করে কোনো লাভ হবে না। পরে ২০১৯ সালের এপ্রিলে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায়।


প্রকল্পের আওতায় নির্মাণকাজ চীন সরকারের ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়িত হলেও পরামর্শক সেবার ব্যয় জিওবি থেকে নির্বাহ করা হবে। কাজেই পরামর্শকের বেতন-ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জিওবি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন সমীক্ষা প্রকল্পের পরামর্শকদের বেতন-ভাতার হার অনুযায়ী নির্ধারণ করা যৌক্তিক হবে। চলমান পদ্মা ব্রিজ রেল লিংক প্রকল্পের পরামর্শকের বেতন-ভাতার আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে।


এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) মামুনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পটি চীনা অর্থায়নে জিটুজি পদ্ধতিতে হচ্ছিল। কিন্তু মাঝখানে নানা কারণে এটা হয়নি। তবে আশার আলো হচ্ছে প্রকল্পটি অবশেষে চীনা অর্থায়নেই হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। নানা কারণে সিলেট-আখাউড়া রুটটি আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ ডেস্ক