সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মফস্বল বা গ্রাম এলাকায় কোনো এমপিওভুক্ত কলেজের চার কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কলেজ স্থাপনের নিয়ম নেই। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।
সম্প্রতি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় দুটি ভুয়া কলেজ স্থাপনে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির নাম সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজ ও সড়কের বাজার মহিলা কলেজ। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ও পরিসংখ্যান কার্যালয়ের সরকারি নথি জালিয়াতি করে দুটি কলেজের পক্ষে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করা হয়।
বোর্ডের অনুমোদন না মিললেও এই দুই কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। সড়কের বাজার মহিলা কলেজের স্বঘোষিত সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলমের (যিনি মূলত উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা সহকারী পদে কর্মরত) প্রভাবে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চলতি মাসেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে।
বাংলাদেশে নতুন বেসরকারি কলেজ স্থাপন ও পাঠদানের অনুমতি পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী একাধিক শর্ত পূরণ করতে হয়। জমির পরিমাণ ও অবকাঠামো, শিক্ষার্থী সংখ্যা, এলাকার চাহিদা, আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শিক্ষক আছেন কি না, তা দেখা হয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র ও উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের জনসংখ্যার সনদপত্র।
এর ভিত্তিতে ওই উপজেলায় আরও কলেজের প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণ করা হয়। সড়কের বাজার মহিলা কলেজের প্রত্যয়ন ও সনদপত্র দুটিই ভুয়া ছিল।
জানা যায়, সড়কের বাজার মহিলা কলেজের প্রত্যয়নের জন্য আবেদন করেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। আবেদনে তিনি নিজেকে কলেজটির বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আবেদনে কানাইঘাট উপজেলাকে জনবহুল ও শিক্ষাবঞ্চিত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র সিলেট শিক্ষা বোর্ডে জমা দেন।
কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ইউএনও স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র যেটি জাহাঙ্গীর আলম জমা দিয়েছেন সেটি ছিল ভুয়া। তার জমা দেওয়া আবেদনপত্রের স্মারক নম্বরের শেষ চার সংখ্যা ১৪৯৪, যা মূলত একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনের জন্য কৃষি কর্মকর্তাকে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার স্মারক নম্বর। অথচ একই নম্বরের স্মারকে মো. জাহাঙ্গীর আলম নিজের মতো করে প্রত্যয়নপত্র তৈরি করে শিক্ষা বোর্ডে জমা দেন।
একইভাবে জালিয়াতি করেছেন উপজেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের জনসংখ্যা সনদপত্রেও। বোর্ডে যে সনদপত্র জমা দেওয়া হয়েছে তাতে স্বাক্ষর করেন উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আতিকুল কবীর। তারিখ উল্লেখ ছিল ২০২৫ সালের ১৬ জুন। অথচ এই কর্মকর্তা ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত এ অফিসে কর্মরত ছিলেন, অর্থাৎ এই নথিটিও ভুয়া।
অভিযোগের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘প্রভাবের কিছু নেই। স্থানীয়রা চেয়েছেন, আমি আবেদন করেছি। জালিয়াতির বিষয়টি অন্য বিষয়। এটি বোর্ডের অভ্যন্তরের ঘটনা। আমরা মন্ত্রণালয়ে ফের আবেদন করেছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছে কলেজটির অনুমোদন দেওয়া হবে।’
মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো তথ্য নেই।’ তবে কলেজে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সর্বশেষ ভর্তি নীতিমালায় অনুমতি ও স্বীকৃতিবিহীন কলেজ ও সমমান প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নীতিমালার ৮.১ ধারায় বলা হয়েছে, স্থাপনের অনুমতি আছে কিন্তু পাঠদানের অনুমতি নেই এমন কলেজ শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না।
কিন্তু কলেজ দুটির ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশনের গল্প আরও ভিন্ন। স্থানীয় শাহবাগ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ বশির আহমদ। তিনি স্কুল শাখার শিক্ষক। কিন্তু তিনি সরকারি বিধির ধার ধারেন না। তিনি সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজের স্বঘোষিত সভাপতি ও ডিরেক্টর। এই কলেজে শিক্ষকসহ জনবল নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেন। এই শিক্ষক বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থী ম্যানেজ করে অনুমোদনহীন কলেজটিতে ভর্তি করান।
মানবিক বিভাগে কলেজটিতে ভর্তি হয়েছেন এমন অন্তত ১৮ শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন ও রোল নম্বর খবরের কাগজের হাতে রয়েছে। ওই কলেজের সরকারি নিবন্ধন না থাকায় অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করেছেন শাহবাগ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে।
জানতে চাইলে বশির আহমদ নিজেকে স্কুল শাখার শিক্ষক বলে নিশ্চিত করেন। তিনি সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজের স্বঘোষিত সভাপতি ডিরেক্টর কি না, এমন প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে যান, যা ইচ্ছা তার ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জোর গলায় বলেন।
অনুমোদনবিহীন ওই কলেজটিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির দায়িত্বে আরও একজন আছেন। তিনি কানাইঘাট সরকারি কলেজের প্রভাষক শিহাব উদ্দিন। একই সঙ্গে সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজের স্বঘোষিত ডেপুটি ডিরেক্টর। তিনি এই কলেজে ২১ শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান বিভাগে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সড়কের বাজার মহিলা কলেজে ছাত্রী ভর্তির দায়িত্বে আছেন গাছবাড়ী আইডিয়াল কলেজের প্রভাষক (আইসিটি) রুমেন আহমেদ। তিনি বিজ্ঞান বিভাগের আট ছাত্রীকে অর্থের বিনিময়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
তবে মহিলা কলেজটির মানবিক বিভাগের দায়িত্বে আছেন সানুর মিয়া। তিনি চরিপাড়া উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের প্রধান। মহিলা কলেজটিতে ভর্তি হওয়া মানবিক বিভাগের ২৩ জন শিক্ষার্থীকে তিনি নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে রুমেন আহমেদ বলেন, ‘আমি কলেজের সাধারণ শিক্ষক, আমি প্রিন্সিপাল নই। অনলাইনে কোনো রেজিস্ট্রেশন আমি করিনি। অর্থ নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। আমরা শুধু আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করেছি।’
সিলেট শিক্ষা বোর্ড বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজ ও সড়কের বাজার মহিলা কলেজ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে না–এমন আদেশ দেয়। শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম যেন পরিচালনা করতে না পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটির বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি।
জানতে চাইলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা অব। তারা জালিয়াতি করে বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করেছে। এখনো স্থানীয় প্রভাবশালীদের ফোন আসছে। কিন্তু আমরা অনুমোদন দিইনি। এই দুই অনুমোদন না পাওয়া কলেজে ভর্তি না করার বিষয়ে বোর্ডের পক্ষে আদেশ জারি করা হয়েছে।’
শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে তিনি বলেন, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী ভুয়া কলেজও শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে। অন্য কলেজের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা যায়। এমন নিয়মে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই নিয়ম বাদ দিতে আমরা আন্তশিক্ষা বোর্ডে আবেদন করেছি। নিয়ম পরিবর্তন না হলে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়বে। ইআইআইএন (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ নম্বর) ছাড়া প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সন্তান ভর্তি করা উচিত নয়।’
আন্তশিক্ষা বোর্ড কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, যারা নিয়মের সুযোগ নিচ্ছে, এটি তাদের বিষয়। নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হতেই এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম ঘটলে আইন প্রয়োগ করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, চলতি বছরের ১৫ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ শাখা-৬-এ জাল সনদ দাখিলকারী সড়কের বাজার মহিলা কলেজ নামীয় অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের স্বঘোষিত সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছে।
১০০ গজের ব্যবধানে দুটি অনুমোদনহীন কলেজের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সিলেট শিক্ষা বোর্ড ও মাউশিকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ ডেস্ক
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.