প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ২১:১৫ (শুক্রবার)
জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা: গণতন্ত্র, দক্ষতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

রাষ্ট্র পরিচালনার মান উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করার প্রশ্নে জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়।
 

তবে সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি নির্ধারণের বিষয়ে হাইকোর্টের রুল জারির পর বিষয়টি নতুন করে জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ, সৎ ও শিক্ষিত নেতৃত্ব দেখতে আগ্রহী।
 

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। আইন প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা, ডিজিটাল প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর নীতিনির্ধারণ—এসব ক্ষেত্র সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ছাড়া কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। ফলে জনপ্রতিনিধিদের একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ভিত্তি থাকা রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
 

আমার মতে, পদ ও দায়িত্বের পরিধি বিবেচনায় শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন—মেম্বার বা কাউন্সিলর পদে এসএসসি বা এইচএসসি, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে ন্যূনতম স্নাতক, সংসদ সদস্য পদে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর এবং মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী পদে স্নাতকোত্তর বা সমমানের উচ্চশিক্ষা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রমাণিত দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। যদি জনপ্রতিনিধিদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে সেই নীতি অবশ্যই সকল স্তরের জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদ বা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কঠোর শর্ত আরোপ করে জাতীয় পর্যায়ে তা উপেক্ষা করা হলে তা ন্যায়বিচার ও সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। সংবিধানের চেতনা ও আইনের শাসনও বৈষম্যমুক্ত নীতিমালা প্রত্যাশা করে।


তবে এটাও সমানভাবে সত্য যে, শিক্ষাগত সনদ কখনোই একজন জনপ্রতিনিধির একমাত্র যোগ্যতার মানদণ্ড হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি জনস্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন, আবার অনেক তুলনামূলক কম শিক্ষিত নেতা সততা, দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন। তাই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সততা, নৈতিকতা, জবাবদিহিতা, দেশপ্রেম, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রশাসনিক দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য স্থানীয় সরকার আইন, সংবিধান, প্রশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট প্রণয়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। এতে প্রতিনিধিরা তাঁদের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব আরও দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবেন।
 

গণতন্ত্রে জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস। জনগণের ভোটাধিকার যেমন অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার মান উন্নয়নের জন্য প্রতিনিধিদের ন্যূনতম যোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য কেবল নির্বাচন আয়োজন নয়; বরং যোগ্য, দক্ষ, সৎ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।

পরিশেষে বলা যায়, জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিতর্ককে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে বিবেচনা করা উচিত। কেবল ডিগ্রি নয়, আবার কেবল অভিজ্ঞতাও নয়—সুশিক্ষা, সততা, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং জনসেবার প্রতি অঙ্গীকারের সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করতে।
 

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক ইংরেজি, আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।