শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য সঠিক পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | কিন্তু অনেক শিশুই কোষ্ঠকাঠিন্যের (Constipation) সমস্যায় ভোগে | এটি এমন একটি সমস্যা যা শুধু শিশুর শারীরিক অস্বস্তিই সৃষ্টি করে না, বরং তার স্বাভাবিক খাওয়া দাওয়া, ঘুম, খেলাধুলা এবং মানসিক স্বস্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে | অনেক অভিভাবক মনে করেন, প্রতিদিন মলত্যাগ না হলে সেটিই কোষ্ঠকাঠিন্য | বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয় | শিশুর বয়স, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে মলত্যাগের স্বাভাবিক নিয়ম ভিন্ন হতে পারে |
সাধারণভাবে, যদি শিশুর মল শক্ত হয়ে যায়, মলত্যাগের সময় ব্যথা হয়, অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়, অথবা কয়েকদিন পরপর মলত্যাগ হয় এবং এতে শিশুর কষ্ট হয়, তাহলে সেটিকে কোষ্ঠকাঠিন্য Constipation হিসেবে বিবেচনা করা যায় |
কোষ্ঠকাঠিন্য কেন হয় ?
শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্যের অন্যতম কারণ হলো খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন | ছয় মাস বয়সের পর যখন শিশুকে সম্পূরক খাবার দেওয়া শুরু হয়, তখন অনেক সময় পর্যাপ্ত আঁশ ও পানি না পাওয়ার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে |
আরও কিছু সাধারণ কারণ হলো
পর্যাপ্ত পানি পান না করা |
শাকসবজি ও ফলমূল কম খাওয়া |
অতিরিক্ত ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া |
দীর্ঘ সময় মল চেপে রাখা |
খেলাধুলা ও শারীরিক নড়াচড়া কম করা |
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া |
বিরল ক্ষেত্রে জন্মগত বা অন্ত্রের কিছু রোগ |
বয়সভেদে কোষ্ঠকাঠিন্য
শুধু বুকের দুধ খাওয়া শিশু :
অনেক সময় বুকের দুধ খাওয়া শিশু কয়েকদিন পরপর মলত্যাগ করতে পারে | যদি মল নরম থাকে এবং শিশুর কোনো অস্বস্তি না থাকে, তাহলে সাধারণত এটি স্বাভাবিক |
সম্পূরক খাবার শুরু হওয়ার পর :
নতুন খাবারের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময় মল শক্ত হতে পারে | এ সময় পর্যাপ্ত পানি ও আঁশযুক্ত খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ |
স্কুলগামী শিশু :
অনেক শিশু স্কুলে টয়লেট ব্যবহার করতে না চাওয়ায় মল চেপে রাখে | এর ফলে ধীরে ধীরে কোষ্ঠকাঠিন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে |
কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
দুই বা তিন দিনের বেশি মল না হওয়া |
মল শক্ত ও শুকনো হওয়া |
মলত্যাগের সময় কান্না করা |
পেটব্যথা বা পেট ফুলে থাকা |
খাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া |
মলের সঙ্গে সামান্য রক্ত যাওয়া |
অন্তর্বাসে অল্প অল্প মল লেগে থাকা |
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন ?
১. পর্যাপ্ত পানি পান করান
বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে |
২. আঁশযুক্ত খাবার দিন
প্রতিদিন ফল, শাকসবজি, ডাল, ওটস এবং অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করুন |
৩. নিয়মিত টয়লেটের অভ্যাস
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে টয়লেটে বসতে উৎসাহ দিন | বিশেষ করে সকালের নাশতার পর এই অভ্যাস ভালো |
৪. শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখুন
খেলাধুলা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে সাহায্য করে |
৫. শিশুকে বকাঝকা করবেন না
মলত্যাগে সমস্যা হলে শিশুকে ভয় দেখানো বা শাস্তি দেওয়া উচিত নয় |
কোন খাবার উপকারী ?
পেঁপে
কলা (অতিরিক্ত কাঁচা নয়)
নাশপাতি
আপেল
বরই
কমলা
পালং শাক
লাল শাক
মিষ্টিকুমড়া
ওটস
ডাল
পর্যাপ্ত পানি
কোন খাবার সীমিত করবেন ?
অতিরিক্ত চিপস
চকোলেট
ফাস্টফুড
কোমল পানীয়
অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড |
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন ?
নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত
এক সপ্তাহের বেশি সমস্যা থাকলে |
মলের সঙ্গে রক্ত গেলে |
তীব্র পেটব্যথা হলে |
বারবার বমি হলে |
শিশুর ওজন কমে গেলে |
জ্বর থাকলে |
জন্মের পর থেকেই মলত্যাগে সমস্যা থাকলে |
ওষুধ সম্পর্কে সতর্কতা
অনেকেই ফার্মেসি থেকে নিজের ইচ্ছামতো জোলাপ কিনে শিশুকে খাওয়ান | এটি বিপজ্জনক হতে পারে | শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ওষুধ প্রয়োজন হলে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে | কারণ, সব শিশুর জন্য একই ওষুধ বা একই মাত্রা নিরাপদ নয় |
অভিভাবকদের জন্য কিছু পরামর্শ
শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার রাখুন |
শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করতে উৎসাহিত করুন |
টয়লেট ব্যবহারে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করুন |
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে উৎসাহ দিন |
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো জোলাপ ব্যবহার করবেন না |
দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
জনস্বাস্থ্য দৃষ্টিকোণ
বাংলাদেশে শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি বড় কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি না পান করা এবং সচেতনতার অভাব | পরিবার, বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে এ সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব | শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতা, সুষম খাদ্য এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প নেই।
শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য সাধারণ সমস্যা হলেও এটিকে অবহেলা করা উচিত নয় | অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত টয়লেটের অভ্যাস এবং শারীরিক সক্রিয়তার মাধ্যমে এ সমস্যা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব | তবে দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে বা বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মনে রাখবেন, সুস্থ অন্ত্র মানেই সুস্থ শিশু | আর সুস্থ শিশুই একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি।
মনজুরুল মাআবুদ: এমকম (হিসাববিজ্ঞান), এমপিএইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.