অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সতর্ক অবস্থানের কারণে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ পাঁচ ঘণ্টার সচিব কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসেনি।
পে স্কেল বাস্তবায়ন এখনো কাগজেই আটকে আছে। জুলাইয়ে গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মাস শেষ হতে চললেও গেজেট আসেনি। ফলে নতুন পে স্কেলের অপেক্ষায় রয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সঙ্গে আছেন প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী। আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জট কেটে সচিব কমিটির সুপারিশ সমন্বয় করা সম্ভব হলে দ্রুতই আসতে পারে বড় ঘোষণা।
অর্থনীতিবিদ ও সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, মূলত দুই প্রধান চ্যালেঞ্জের কারণে নতুন পে স্কেলের চূড়ান্ত অনুমোদন পিছিয়ে যাচ্ছে—
১. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইতোমধ্যে সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশনসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নবম পে স্কেল পুরোপুরি কার্যকর করতে বাড়তি আরো ৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন, যা দেশের বর্তমান রাজস্ব ঘাটতির মাঝে বড় চ্যালেঞ্জ।
২. আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে জানিয়েছে, একসঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ বাজারে এলে নগদ প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতি আরো উসকে যেতে পারে। এ ছাড়া রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে সরকারের ঋণের বোঝা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে সংস্থাটি বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আরো দুই বছর স্থগিত রাখার পরামর্শ দেয়। তাদের যুক্তি, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আগেই গেজেট প্রকাশ করে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রস্তাবটি এখন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সচিব পর্যায়ের কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হলে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে তা মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর শুরু হবে আইনি প্রক্রিয়া। প্রয়োজনীয় ভেটিং শেষে প্রকাশ করা হবে গেজেট। গেজেটের আগে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অর্থ ছাড় কিংবা বেতন পরিশোধের সুযোগ নেই।
সচিব পর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রস্তুত পৃথক সুপারিশ পর্যালোচনা করেছে। সেগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার কাজও হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানোর উপযোগী পর্যায়ে এলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।
সূত্র জানায়, সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চায় না। তবে একসঙ্গে বড় আর্থিক চাপ এড়াতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট গ্রেডে অগ্রাধিকার সুবিধা এবং আর্থিক চাপ কমানোর মতো কয়েকটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে অর্থ বিভাগ।
উল্লেখ্য, বর্তমান অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ সময় জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে জোরালো হয়ে উঠেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের অধীনে কর্মরত প্রায় ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী নতুন পে স্কেলের আওতায় আসবেন। মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। এর ফলে সরকারের পেনশন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
বর্তমানে বাংলাদেশ আইএমএফের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। আইএমএফের আশঙ্কা, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় বড় আকারে বৃদ্ধি পাবে। এতে বাজেট ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ ধারণা করছেন, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় অন্তত ৮২ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি পেনশন, উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ ডেস্ক
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.