ছবি: সংগৃহিত
আমি কিতা কইতাম, আমার আর কিচ্ছু নাই। আমার আর সম্ভল রইলোনা গো। দুই অবুঝ বাচ্চা লইয়া কেমন চলতাম। আমি কেমনে বাঁচতাম গো- এভাবেই করুণ বিলাপ দিয়ে আর্তনাদ করছেন সুনামগঞ্জে জগন্নাথপুর পৌরসভার ভবানিপুর গ্রামের গৃহবধূ চম্পা দেবনাথ।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) ভোরে নৌকাডুবিতে গ্রামের ৪ ব্যক্তির সাথে নিখোঁজ হন স্বামী হেমেন্দ্র দেবনাথ।দিনব্যাপী সন্ধান করে নিখোঁজদের মধ্যে দুজনের লাশ উদ্ধার হলেও নিখোঁজ রয়েছে চম্পার স্বামী হেমেন্দ্রসহ দুই জন।
হেমেন্দ্র দেবনাথ পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। তিনি দুই বছরের এক ছেলে ও ৫ বছর বয়সী এক মেয়ের জনক। স্বামীর অনিশ্চিত পরিণতিতে অসহায় চম্পা ও তাঁর সন্তানরা।
জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় পার্শ্ববর্তী বালুচর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে কীর্তন অনুষ্ঠান দেখেতে গিয়েছেন পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের ৯-১০জন বাসিন্দা। ভোরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে ডিঙি নৌকাযোগে মইয়ার হাওর হয়ে বাড়িতে ফিরছেলেন তারা।
এ সময় দমকা বাতাসের কবলে পড়ে নৌকাটি ডুবে যায় হাওরে। নৌকায় থাকা বেশিরভাগ লোকজন সাঁতার কেটে পারে চলে এলেও ৪ জন পানিতে ডুবে নিখোঁজ হন।
তারা হলেন,গ্রামের অরুণ দেবনাথ (৪৫), অধির দেবনাথ (৫০), হেমেন্দ্র দেবনাথ (৫৫) ও সতীন্দ্র দেবনাথ (৫২)।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে স্থানীয়দের সহযোগীতায় অরুণ দেবনাথ ও সতীন্দ্র দেবনাথ নামের দুই জনকে উদ্ধার করা হয়। হাওরের বিশালতা ও দুর্ঘটনার স্থান সনাক্ত করতে না পারায় দিনব্যাপী উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েও বাকি দুজনের সন্ধ্যান পায়নি উদ্ধারকারী দল।
নৌকা ডুবিতে বেঁচে ফেরা গ্রামের নিশি দেবনাথ বলেন, কীর্তন দেখে রাত ৩ টার দিকে আমিসহ গ্রামের ৯ জন বাড়ি ফিরছিলাম। মাঝ হাওরে আসার পর হঠাৎ দমকা হাওয়ায় নৌকা ডুবে যায়। আমি নৌকার পেছনে থাকায় আগেই নদীতে পড়ে গেছিলাম। হাওরে কোনো ঠাঁই নাই। অনেক সময় সাঁতার কাটছি। শরীর ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। আমি বাঁচার আসা ছেড়ে দিয়েছিলাম। শ্বাস নিতে পারছিলাম না। একটা মাছ ধরার নৌকা এসে আমিসহ ৫জনকে উদ্ধার করে। বাকি ৪ জন পানিতে ডুবে যায়।
জয়িতা দেবনাথ নামের নিহতদের এক স্বজন বলেন, এমন ঘটনা আমাদের গ্রামে আর হয়নি। আমরা ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। যাঁরা মারা গেছে, যাঁরা নিখোঁজ রয়েছে সবাই দিনমুজুর। পরিবারগুলো অসহায় হয়ে গেছে। সরকার না দাঁড়ালে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।
সুনামগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের অধিনায়ক সোহেল রানা বলেন, সকালে আমাদের খবর আসে জগন্নাথপুরের মইয়ার হাওরে নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ রয়েছে ৪ জন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে প্রথমে সুনামগঞ্জের ডুবুরিদল ও পরে সিলেট থেকে আরেকটি ডুবুরিদল এসে উদ্ধার তৎপরতা চালায়। দিনব্যাপী উদ্ধার কাজে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ২ জনকে মৃত অবস্থায় করা হয়েছে। রাত হওয়ায় প্রথম দিনের উদ্ধার কাজ স্থগিত করা হয়েছে। রবিবারও উদ্ধার কাজ পরিচালনার কথা জানান তিনি।
নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়ে জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, নৌকা ডুবির বিষয়টি সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ অবগত। সারাদিন ঘটনাস্থলে ছিলাম। প্রতিটি পরিবারকে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রাথমিক অর্থ সহায়তা করা হয়েছে। এমপির নির্দেশক্রমে সরকারের সকল সহযোগিতা পর্যাক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে প্রদান করার কথা জানান তিনি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাহিদনূর/ইকে
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.