প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩২ (মঙ্গলবার)
জ্যামাইকা হয়ে উঠেছিল বেইলি রোড: ঢাকা ড্রামার ৩০ বছরে ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’

কিছু উৎসব মঞ্চে শেষ হয় না, মঞ্চের বাইরেও স্মৃতিচিহ্ন রেখে যায়। ঢাকা ড্রামার ৩০ বছর পূর্তির উৎসব ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’ ছিল তেমনই একদিন। দিনটি ছিল আড্ডায় সরব আর থিয়েটারে পিনপতন নীরবতা।

প্রবাসে বাংলা নাট্যচর্চার তিন দশক উদযাপনে গত ১ আগস্ট নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে দিনব্যাপী এই নাট্যোৎসবের আয়োজন করে ঢাকা ড্রামা। দুপুর ১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এক টিকিটে ছয়টি নাটক, গোলটেবিল আলোচনা আর থিয়েটার পোস্টার প্রদর্শনীতে একদিনের জন্য জ্যামাইকা হয়ে উঠেছিল ঢাকার বেইলি রোড।

বন্ড স্ট্রিট থিয়েটার ও শিনবোন অ্যালি স্টিল্ট ব্যান্ডের সংগীত-নৃত্যে ফ্রন্ট ইয়ার্ডে শুরু হয় উৎসব। মূলমঞ্চে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সঞ্চালনা করেন ফেস্টিভ্যাল চেয়ার গার্গী মুখার্জি। উদ্বোধন করেন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির টিশ স্কুল অব দ্য আর্টসের প্রফেসর এমেরিটাস রিচার্ড শেকনার। প্রধান অতিথি ছিলেন জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিংয়ের পরিচালক কোর্টনি ফ্রেঞ্চ। সম্মানিত অতিথি বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আবদুস সেলিম ও প্রতিষ্ঠাতা ড. বাবুল বিশ্বাস। বিশেষ অতিথি ছিলেন ‘দ্য লায়ন কিং’ খ্যাত ফাইট ডিরেক্টর রিক সর্ডেলেট।

উৎসবে ছয়টি নাটক ছয় রকমের মানুষের গল্প বলেছে।

দুপুরে মঞ্চে আসে একতা অব নিউজার্সির ‘শিখণ্ডী’। সুদীপ্ত ভৌমিকের লেখা ও সুমন মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মহাভারতের শিখণ্ডী এখানে জেন্ডার, ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। বিকেলে ফ্রন্ট ইয়ার্ডে এপিক অ্যাক্টরস ওয়ার্কশপের ‘ভুল রাস্তা: দ্য রং রুট’। বাদল সরকারের লেখা ও সুভাষিস দাস-তন্দ্রা দাসের নির্দেশনায় ইতিহাসের পাতায় জায়গা না পাওয়া সাধারণ মানুষের গল্প।

নাটকের বিরতিতে ছিল নাটক নিয়ে কথা। বিকেল সাড়ে ৪টায় গোলাম সারওয়ার হারুনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল আলোচনা উৎসবকে শুধু প্রদর্শনী থেকে সংলাপে নিয়ে যায়।

সন্ধ্যায় মঞ্চে অন ডায়লগের ‘যমুনা’। সেলিনা শেলীর লেখা ও শামসুল আলম বকুলের নির্দেশনায় যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এক শিল্পীর ক্ষত ও মানবতার খোঁজ। এরপর ফ্রন্ট ইয়ার্ডে রেডিক্যাল ইভোলিউশনের ২০ মিনিটের ভিন্ন স্বাদের প্রযোজনা ‘লুক বিফোর ইউ লিপ’ - স্যান্ডউইচ আর্টিস্ট, পুলিশ আর পপ মিউজিক্যালের সংঘাতে এক সাবওয়ে ট্র্যাজেডি।

দিনের শেষ ও মূল প্রযোজনা ছিল ঢাকা ড্রামার নিজস্ব নাটক ‘নিরাকার’। গোলাম সারওয়ার হারুনের রচনা ও গার্গী মুখার্জি এবং হারুনের যৌথ নির্দেশনায় প্রবাস, বিশ্বাস, পরিচয় ও সৃষ্টিকর্তাকে ঘিরে মানুষের অন্তহীন প্রশ্ন উঠে আসে। ভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের এক শহরে মিশে যাওয়ার গল্পটি শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় নিউইয়র্কের এক মর্মান্তিক হেইটক্রাইম ও সাবওয়ে ট্র্যাজেডিতে।

মঞ্চের পাশাপাশি ছিল আরেক ইতিহাস। বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের তত্ত্বাবধানে দিনব্যাপী থিয়েটার পোস্টার প্রদর্শনী মনে করিয়ে দেয় - নাটক শেষ হয়, সেট খুলে যায়, কিন্তু পোস্টার-ছবিটুকুই একদিন দলিল হয়ে থাকে।

প্রবাসে তিন দশক ধরে নাটকের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কেবল ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়, একটি সাংস্কৃতিক অর্জন। ঢাকা ড্রামা, একতা, অন ডায়ালগ, রেডিক্যাল ইভোলিউশন, বন্ড স্ট্রিটের মতো ভিন্ন ভিন্ন পটভূমির দলগুলোকে এক আঙিনায় এনে ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’ প্রমাণ করেছে এর তাৎপর্য। মুখোশ থাকে, রূপক থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে মানুষই।

মঞ্চের আলো একসময় নিভে যায়, নাটক ফুরায়। থেকে যায় মানুষ, সম্পর্ক আর ভালোবাসা।

ঢাকা ড্রামাকে ৩০ বছরের এই দীর্ঘ নাট্যযাত্রার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন সুধীজন। মঞ্চের আলো জ্বলতে থাকুক, গল্প চলতে থাকুক, আর নাটকের মানুষগুলোর এমন আড্ডা বারবার ফিরে আসুক নিউইয়র্কে এমন প্রত্যাশা ঢাকা ড্রামার সকল নেতৃবৃন্দের।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/এসবিআর/পিডি