প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০০ (মঙ্গলবার)
যে মামলা থেকে শেখ হাসিনাসহ ১০৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

২০২৪ সালের আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ‘গুলিতে’ কসাই রিপন ফকির হত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০৪ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে বগুড়া আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
 

মামলার সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই ফেরদৌস আলী সম্প্রতি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। আগামী ১০ আগস্ট চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
 

সোমবার দুপুরে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ফেরদৌস আলী জানান, এজাহারে গুলিতে রিপন ফকিরের মৃত্যুর কথা বলা হলেও ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কোনো ইনজুরি উল্লেখ ছিল না। এছাড়া বাদী নিহতের স্ত্রী মাবিয়া বেগম ও ভাই সাক্ষীতে বলেছেন- তিনি (রিপন) গলায় রুটি আটকে গিয়ে মারা গেছেন। সেই সময় পত্র-পত্রিকা ও টিভি রিপোর্টে গলায় রুটি আটকে রিপন ফকিকের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মেডিকেল রিপোর্ট ও বাদীর সাক্ষীর ভিত্তিতে আসামিদের মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা অবগত আছেন।

এ প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বগুড়া ইউনিটের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল বাছেদ বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রিপন ফকির হত্যা মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়ার কথা শুনেছেন।
 

তিনি বলেন, বাদীর মতামত নেওয়া হবে। তিনি (বাদী) এ ব্যাপারে আপত্তি করলেই কেবল আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্টের ব্যাপারে নারাজি দেবেন।

মামলা ও অন্যান্য সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত ২০২৪ সালে ৪ আগস্ট দুপুরে বগুড়া শহরের ২নং রেলগুমতি এলাকায় ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে’ ‘নিহত হন’ কসাই রিপন ফকির। তিনি বগুড়া সদর উপজেলার বানদীঘি ফকিরপাড়ার বাসিন্দা। গোদারপাড়া এলাকায় মাংসের ব্যবসা করতেন। পরে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়। এ ব্যাপারে নিহতের স্ত্রী মাবিয়া বেগম গত ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সদর থানায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১০৪ জনের নাম উল্লেখ করে ৪০৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেন। পরে মামলাটি তদন্তের জন্য বগুড়া ডিবি পুলিশকে দেওয়া হয়।
 

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বগুড়া শহরের ঝাউতলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় তার স্বামী রিপন ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মামলার ১ থেকে ১৩ নম্বর আসামির উসকানি ও প্রত্যক্ষ মদদে অন্য আসামিরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। তাদের হাতে লাঠি, ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। মামলার ১৯ নম্বর আসামি সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম বাদীর স্বামী রিপন ফকিরকে গুলি করেন।

এদিকে মামলার পর বাদী মাবিয়া বেগম ও তার দেবর সাংবাদিকদের জানান, রিপন ফকির আন্দোলনে গিয়ে গুলিতে নয়; রুটি খাওয়ার সময় গলায় আটকে মারা গেছেন। দুইজন অজ্ঞাত ব্যক্তি সহযোগিতার নামে তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছেন। তিনি এ মামলা সম্পর্কে কিছু জানেন না। তাকে বলা হয়েছিল, কাগজে স্বাক্ষর করলে রিপন ফকিরকে ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি এবং সরকারি অনুদান পাওয়া যাবে। সেই আশায় তিনি থানায় গিয়ে কাগজে স্বাক্ষর দিয়েছেন।
 

পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে মৃত্যুর ১১২ দিন পর গত ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর বানদীঘি ফকিরপাড়ার কবরস্থান থেকে রিপন ফকিরের লাশ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। পরে যথাযথ মর্যাদায় আবারও দাফন করা হয়।

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী মামলাটি তিনজন কর্মকর্তা তদন্ত করেন। তদন্তে ২২ জন সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়। এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার সময় বগুড়া শহরের ঝাউতলা এলাকার দোকানপাট ১ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ ছিল।

ওই এলাকার তিনজন দোকান কর্মচারী জানিয়েছেন, তারা এমন কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি।
 

এছাড়া বাদীসহ সাতজন সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেছেন, রিপন ফকির ৫ আগস্ট গোদারপাড়া এলাকায় পাউরুটি খাওয়ার সময় গলায় আটকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়েছে।

গোদারপাড়া এলাকায় চায়ের দোকানি শামিম প্রামাণিক তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছেন, রিপন ফকির তার দোকান থেকে পাউরুটি কিনে খাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন।

রিপন ফকিরকে দাফনের আগে লাশের গোসল ও জানাজার ইমামতি করেন স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মাওলানা নাজিরুল ইসলাম। তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, লাশে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
 

এছাড়া ২০২৫ সালের ২০ মার্চ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ থেকে দেওয়া ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃতের শরীরে ইনজুরির কোনো উল্লেখ নেই।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ‘শহীদদের’ প্রাথমিক তালিকায় রিপন ফকিরের নাম থাকলেও চূড়ান্ত গেজেটে তার নাম নেই। নিহতের পরিবার কিছু রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১৮