ছবি: সিলেট ভিউ।
সিলেটের সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ। এই দুই উপজেলা নিয়েই গঠিত জাতীয় সংসদের সিলেট-৫ আসন। উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলেছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী,যে নদী একসময় এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই নদীই এখন পরিণত হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগের প্রতীকে। প্রতি বর্ষায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেই শুরু হয় ভয়াবহ নদীভাঙন। নাব্যতা সংকট, তীব্র স্রোত ও অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে বছরের পর বছর ধরে ভাঙনের কবলে পড়ে শত শত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
ভারতের বরাক নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী আমলশীদ পয়েন্টে এসে নদীটি দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। একটি শাখা সুরমা এবং অপরটি কুশিয়ারা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর দুটি নদী কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ হয়ে সিলেট জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু নদীর এই স্বাভাবিক প্রবাহ এখন সীমান্ত এলাকার ভূপ্রকৃতিতেও পরিবর্তন আনছে। বিশেষ করে জকিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে বাংলাদেশ-ভারতের সীমারেখাও বিভিন্ন স্থানে পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর নদীভাঙন চললেও স্থায়ী কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত একর ফসলি জমি, বসতভিটা, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও সরকারি স্থাপনা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
নদীভাঙনের পুরনো ক্ষত শুকানোর আগেই সম্প্রতি সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পর নতুন করে বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন ‘কাটা গায়ে নুনের ছিটা’। ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিনই নদী কয়েক ফুট করে গ্রাস করছে জনপদ। ফলে আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপারের হাজারো মানুষের।
কানাইঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোসাইনপুর গ্রাম বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অন্যতম। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিক। পরে সরকার সেগুলো পুনর্নির্মাণ করলেও বর্তমানে সেগুলোও আবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এছাড়া উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের খুলুরমাটি ও জিতপুর গ্রাম, নয়াগ্রাম, পৌরসভার ডালাইচর, বায়মপুর, সাতবাক ইউনিয়নের চরিপাড়া এবং লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের উজান বারাফৈইত এলাকায়ও নতুন করে নদীভাঙন শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে জকিগঞ্জ উপজেলায়ও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। উপজেলা সদরের জকিগঞ্জ বাজার এলাকায় নদীভাঙনের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এছাড়া লালগ্রাম, ভাখরশাল, পৌরসভার বাজার এলাকা, মাইজকান্দি গ্রাম এবং বীরশ্রী ইউনিয়নের পীরনগর, পিয়াইপুর ও মাঝরগ্রাম এলাকায়ও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এসব এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, নদীর পাড়ে বসবাস এখন যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়ের সঙ্গে বসবাস। তারা বলেন, প্রতি বছর বর্ষা এলেই আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। কখন যে নদী তাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি কিংবা জীবন-জীবিকার শেষ সম্বলটুকু গ্রাস করবে, সেই অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন তারা।
জকিগঞ্জ প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ কে এম মামুন বলেন, ‘কুশিয়ারা নদীর অব্যাহত ভাঙনে জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, জনপদ, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে সুলতানপুর ইউনিয়ন, বারঠাকুরি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বাজারসংলগ্ন এলাকাসহ একাধিক স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই ভাঙনের কারণে জকিগঞ্জ উপজেলার ভৌগোলিক সীমানাতেও পরিবর্তন এসেছে। দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার ভূপ্রকৃতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
সদর ইউনিয়নের গোসাইনপুর গ্রামের বাসিন্দা লোকমান উদ্দিন বলেন, ‘সুরমা নদীর ডাইকে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। যে কোনো সময় ডাইকটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ডাইকের পাশেই একটি নবনির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, সেটিও এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে।’
ভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দারা সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং স্থায়ী ও টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
তবে আশার খবরও রয়েছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ভয়াবহ ভাঙন রোধে প্রায় ১ হাজার ২৭৩ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের নদীভাঙন সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান বলেন, ‘সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ভাঙনকবলিত এলাকা আমি ইতোমধ্যে পরিদর্শন করেছি। স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি পানি সম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে গ্রহণ করা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীপারের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হবে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ মাহবুব/ এহিয়া-০৯
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.