বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার চলমান। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎও আদালতেই নির্ধারিত হবে। এ বিষয়ে সংবিধানে সবকিছু বলা আছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) এ সভার আয়োজন করে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে এর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও আলোচনা হয়েছে। তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তারা ভুলে গিয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থান ছিল ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সে সময় কেউ কেউ বিপ্লবী সরকার গঠনের কথাও বলেছিলেন, কিন্তু তা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘অনেকে অনেক রকম বক্তব্য দিতে পারেন। তবে আমাদের ঐক্য থাকতে হবে। বিতর্ক সংসদে হতে পারে, রাজপথেও হতে পারে। কেউ কেউ নতুন দল গঠন করে রাজনীতির কথা বলেন। কিন্তু চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার একাত্তরের চেতনার রাজনীতিও ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতির মাঠ অনেক কঠিন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উই হ্যাভ এ প্ল্যান। আমাদের স্বপ্ন আছে। যারা চেতনা বিক্রির রাজনীতি করছেন, তারা কেন যেন পতিত সরকারের পক্ষেই কথা বলছেন। সরকারের বয়স সাড়ে পাঁচ মাস। এখনই রাজপথে বলছেন সরকার ব্যর্থ। ব্যর্থ হতেও তো সময় লাগে।’
ওয়ান-ইলেভেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সবচেয়ে বেনিফিশিয়ারি শেখ হাসিনা। এখন তিনি নিজ দেশে সঠিকভাবে প্রত্যাবর্তন করেছেন।’
ভারতে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভারত তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক থাকে না। বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর সম্পর্ক ঠিক রাখবেন—এটা চলবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই, দুঃখ প্রকাশও করেননি। আমরা শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে চাই। তা না হলে বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার আমাদের নেই। আজকে বলা হয়, জুলাই কার? জুলাই হলো আমাদের সবার।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভুমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে ও অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, ইউট্যাবের যুগ্ম মহাসচিব ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক লুৎফর রহমান, ইউট্যাবের সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এসএম সোহাগ আওয়াল।
অনুষ্ঠানে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভুমিকা ও শহীদদের স্মরণে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন, শহীদ ওয়াসিম আকরামের পিতা শফিউল আলম, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ও ইকরামুল হক সাজিদের মা নাজমা খাতুন লিপি। এসময় তাদেরকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননাও দেওয়া হয়।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আহসান, প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো. শামীম, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এসএম আব্দুর রাজ্জাক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার, ইউট্যাবের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, কোষাধ্যক্ষসহ অসংখ্য শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্য রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তারই চেতনার প্রতিফলন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সমস্ত প্রতিষ্ঠান আক্রমণের শিকার হয়েছে। শেখ হাসিনা যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই চালাতে চেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তার বিপরীত হলেই নির্যাতনের খডগ নেমে এসেছে। যেমনটি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান একটি কলাম লেখার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্য কোনো কারণ দেখাতে পারেনি। এভাবে আরো অনেককেই ফ্যাসিবাদ আক্রমণ করেছে।
তিনি বলেন, আজকে জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে। অথচ সেসময় আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতেন লন্ডন থেকে আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ভারত থেকে আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছাত্রদের প্রত্যেকটি আন্দোলন কর্মসূচিতে বিএনপির প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিলো। তা না হলে ছাত্রদলের ১৪২ জন শহীদ হলো কী করে? আমাদের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে ভরল কেন? পরে জেল থেকে বেরিয়ে শুনছি ১৪-১৫ শ’ মানুষকে হত্যা করেছে শেখ হাসিনা। কতো ভয়ংকর, আগ্রাসী ও রক্তপিপাসু হতো পারে শেখ হাসিনা! আজকে তার ব্যাপারে অনেকেই নরম সুরে কথা বলতে চেষ্টা করছেন কেনো?
রিজভী বলেন, বিরোধী দলের নেতার বাসায় জুলাই অভ্যুত্থানের একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়েছে। যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ বিভিন্ন বিষয় আছে কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কিছু নেই! এটা কেন? তারা যে বলেছিল সবাইকে ক্ষমা করে দিবেন তারই প্রমাণ!
দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত সরকার বলছে সে ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা নেই! এটা কিভাবে সম্ভব? আজকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েছে, মায়ানমার-চীন করিডোরের পরিকল্পনার কারণেই কি হাসিনা কার্ড খেলা হচ্ছে? পলাতক একজন ফ্যাসিস্টকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। এটা তো সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি মর্যাদা দেওয়া হলো না।
রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর কথা বলেন রুহুল কবির রিজভী।
আরেক বিশেষ অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের দিনগুলো আমরা ভুলতে পারি না। তবে জুলাই একদিনে আসেনি। ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা ফ্যাসিবাদের চেহারা দেখেছি। আমরা মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারিনি, স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারিনি। ফ্যাসিবাদীরা চেয়েছিল তাদের মতো করে আমাদের পরিচালনা করতে। এ সময়ে আমাদের অনেক নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন জোরদার হয়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউট্যাব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আমরা থেমে থাকিনি; বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছি।’
স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর আজ দেশে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। সরকারকে সময় দিতে হবে। রাতারাতি কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করি, তাঁর নেতৃত্বে আমরা একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাসিনা তাঁর অহংকারের কারণে জনরোষের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অপরাধের একটি স্বাভাবিক পরিণতি থাকে।’
সভাপতির বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, তাহমিদসহ সব নাম না জানা শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তিনি বলেন, ‘এই বীর সন্তানদের অসীম সাহস, নিঃস্বার্থ ত্যাগ এবং অবিচল সংগ্রামের বিনিময়েই আজ বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি এই আয়োজনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। তাঁদের সন্তানদের তাজা রক্তের বিনিময়েই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমরা একটি নতুন বিজয়ের ইতিহাস অর্জন করেছি।’
বিগত ১৭ বছরের শাসনামলের নিপীড়নের কথা স্মরণ করে ড. মোর্শেদ হাসান খান বলেন, ‘প্রধান অতিথি সালাউদ্দিন আহমদের মতো দেশপ্রেমিক নেতাদের দীর্ঘ ১০ বছর পরিবার ও মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। বিশেষ অতিথি রুহুল কবির রিজভীও বিগত ১৭ বছরের চরম প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তির মধ্যেও একজন অভিভাবকের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) আগলে রেখেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদলের সোনালি ফসল হিসেবে পরিচিত এই নেতৃত্বই আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং বিএনপিকে মূলধারায় পরিচালিত করবে। আমাদের সবাইকে “জুলাই স্পিরিট” এবং “সবার আগে বাংলাদেশ” স্পিরিট ধারণ করে দেশ পরিচালনা করতে হবে। একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করতে হবে এবং তাঁর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৫
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.