প্রকাশিত: ১০ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫১ (মঙ্গলবার)
সিলেটে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, আরও দুইজনের প্রাণহানী

সিলেট বিভাগে হামের পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৮৫২ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ২৫ জন। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছেন আরও দুজন। এক দিনে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩২ জন। সব মিলিয়ে বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩০৯ জন সন্দেহজনক হাম রোগী।


সোমবার (১০ আগস্ট) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রকাশিত হামের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুধু আক্রান্তের সংখ্যা নয়, হাসপাতালে রোগীর চাপ এবং মৃত্যুর সংখ্যাও পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি সামনে আনছে।


স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৮৫২ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটে ২৮০, হবিগঞ্জে ১০৯, মৌলভীবাজারে ১১০ এবং সুনামগঞ্জে ৩৫৩ জন। অর্থাৎ নিশ্চিত আক্রান্তের হিসাবে বিভাগের চার জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জেই রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।


এক দিনে ১৩২ জন হাসপাতালে
হামের বিস্তারের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে হাসপাতালগুলোতে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৩২ জন।


এর মধ্যে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫১ জন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬৩ জন। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন এবং নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চারজন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে পাঁচজন রোগী ভর্তি হয়েছেন।


এক দিনে ১৩২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিপরীতে বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৩০৯। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালেই রয়েছেন ১৫৭ জন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ৮১ জন। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬ এবং নর্থ ইস্ট হাসপাতালে নয়জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।


এ ছাড়া গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন, বিয়ানীবাজারে দুজন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ২৫ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে দুজন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১২ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।


২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু
পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো মৃত্যুর ঘটনা। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।


মৃতদের একজন সুনামগঞ্জের সাত মাস বয়সী শিশু। অপরজন সিলেটের এক বছর তিন মাস বয়সী শিশু। দুজনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।


অর্থাৎ হাম নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে শিশুরাই। তবে সর্বশেষ প্রতিবেদনে মৃতদের শারীরিক অবস্থা, টিকাদানের ইতিহাস, হাম শনাক্ত হওয়ার সময় কিংবা মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে এসব বিষয়ে প্রতিবেদনের বাইরে কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।


মোট মৃত্যু ১২৭
জেলা-ভিত্তিক হিসাব আরও বড় উদ্বেগের চিত্র দিচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত—দুই শ্রেণির মৃত্যু আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে। এ হিসাবে সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে ১২১ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই হিসাব মিলিয়ে মোট মৃত্যু ১২৭ জন।


জেলাভিত্তিক হিসাবে সিলেটে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ৪১ জনের। নিশ্চিত হাম রোগে মারা গেছেন চারজন। সব মিলিয়ে জেলায় মোট মৃত্যু ৪৫।


হবিগঞ্জে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু ১৬ জন; নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যুর তথ্য নেই। মৌলভীবাজারে সন্দেহজনক মৃত্যু ১২ এবং নিশ্চিত মৃত্যু একজন—মোট ১৩ জন। আর সুনামগঞ্জে সন্দেহজনক হাম রোগে ৫২ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে একজনের মৃত্যু হয়েছে; দুই শ্রেণি মিলিয়ে জেলায় মোট মৃত্যু ৫৩ জন।


সুনামগঞ্জে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি
নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যায় সুনামগঞ্জ বিভাগের অন্য তিন জেলার তুলনায় এগিয়ে। এ জেলায় ৩৫৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে সিলেট—২৮০ জন। মৌলভীবাজারে ১১০ এবং হবিগঞ্জে ১০৯ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।


তবে মৃত্যুর হিসাবে চিত্রটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সুনামগঞ্জে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মোট ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চার জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। সিলেটে মোট মৃত্যু ৪৫ জন। মৌলভীবাজারে ১৩ এবং হবিগঞ্জে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রতিদিনের নতুন রোগী, বাড়ছে হাসপাতালের চাপ
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ এক দিনের হিসাব পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। একদিকে ২৫ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে ১৩২ জন সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে দুজনের।


এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, আক্রান্ত বা সন্দেহজনক রোগীদের একটি বড় অংশকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হলে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে—যদিও এ বিষয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদনে সক্ষমতা বা শয্যা-সংকটের কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।


বিশেষ করে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর উপস্থিতি বেশি। বর্তমানে শুধু এই দুই হাসপাতালেই ২৩৮ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।


সামনে বড় প্রশ্ন
সিলেট বিভাগে বছরের শুরু থেকে ৮৫২ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া, এক দিনে ১৩২ জনের হাসপাতালে ভর্তি, ৩০৯ জনের চিকিৎসাধীন থাকা এবং সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে ১২৭ জনের মৃত্যুর তথ্য—সব মিলিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপ্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


বিশেষ করে এক দিনে নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের ১০ আগস্টের প্রতিবেদনে হাম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নির্দিষ্ট পদক্ষেপ, টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতি, টিকাদানের আওতার ঘাটতি কিংবা আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ দেওয়া হয়নি।


তাই সর্বশেষ পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—সিলেট বিভাগে হাম পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি বাড়ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এই অবস্থায় রোগীর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি সন্দেহজনক রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ কতটা জোরদার করা হচ্ছে—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ