প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:৩৯ (শুক্রবার)
সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ্ সিদ্দিকী: প্রত্যাশা এখন বাস্তবায়নের

সিলেট নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় দুর্ভোগ সুপেয় পানির সংকট ও দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। নগরীর জনসংখ্যা ও আয়তন বাড়ার সঙ্গে পানির চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এমন বাস্তবতায় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকীকে সিলেট ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নগরবাসীর মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
 

রবিবার (৯ আগস্ট) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. আকতারুন নেছা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে তিন বছরের জন্য সিলেট ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

মিফতাহ্ সিদ্দিকীর জন্য এটি নিছক একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; বরং সিলেট নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি বড় সুযোগ। কারণ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানির চাপ কম থাকা, পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়া, নতুন এলাকায় পানি সংযোগের সীমাবদ্ধতা, পানির মান নিয়ে উদ্বেগ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার নানা সমস্যা নাগরিক জীবনে দুর্ভোগ তৈরি করছে।
 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মিফতাহ্ সিদ্দিকী দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক ও জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। ছাত্রজীবনে তিনি সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি, সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, সদস্যসচিব ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

বর্তমানে তিনি পাবলিক ভয়েস ওয়ার্কিং ফর বাংলাদেশ ও হলিসিটি কলেজিয়েট স্কুলের চেয়ারম্যান এবং এম সাইফুর রহমান ডিগ্রি কলেজ গভর্নিং বডির দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতার কারণে নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা ওয়াসার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ওয়াসার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নাগরিক সেবার দৃষ্টিভঙ্গিতে পালন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নগরবাসী এখানে দলীয় পরিচয় নয়, কার্যকর সেবা দেখতে চাইবে। একজন চেয়ারম্যান হিসেবে তার সফলতার প্রধান মাপকাঠি হবে—সিলেটের মানুষ নিয়মিত ও নিরাপদ পানি পাচ্ছে কি না, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে কি না এবং ওয়াসার সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ছে কি না।
 

সিলেটের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নেও গতি আনতে হবে। পুরোনো পাইপলাইন, পানির অপচয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নগরীর সম্প্রসারিত এলাকায় পানির চাহিদা—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

একই সঙ্গে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়নও অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন। একটি আধুনিক নগরীর জন্য শুধু বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; ব্যবহৃত পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ দুটোই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

চেয়ারম্যান পদে মিফতাহ্ সিদ্দিকীকে নিয়োগ দেওয়া হলেও ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে এখনো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সাধারণত সরকারের সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় যত ভালো হবে, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম তত বেশি গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
 

এ ক্ষেত্রে মিফতাহ্ সিদ্দিকীর সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—সিলেট ওয়াসাকে একটি জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। নিয়মিত নাগরিক অভিযোগ শোনা, সমস্যা চিহ্নিত করা, দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা এবং ওয়াসার কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার সংস্কৃতি চালু করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।

সিলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও প্রবাসী অধ্যুষিত নগরী। দেশ-বিদেশের মানুষের যাতায়াতের কারণে এই শহরের নাগরিক সেবার মানও উন্নত হওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতের সিলেটকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য।

মিফতাহ্ সিদ্দিকীর তিন বছরের দায়িত্ব তাই শুধু একটি পদে থাকা নয়; এটি সিলেট নগরীর একটি মৌলিক সমস্যা সমাধানে কাজ করার বড় সুযোগ। রাজনৈতিক জীবনে মানুষের সঙ্গে তার যে সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে, সেটিকে যদি তিনি নাগরিক সেবার কাজে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে এই দায়িত্ব তার জন্য যেমন সাফল্যের নতুন অধ্যায় হতে পারে, তেমনি উপকৃত হবে সিলেট নগরবাসীও।

সিলেটবাসীর প্রত্যাশা খুব সহজ—প্রতিশ্রুতি নয়, কল খুললেই পানি আসুক; অভিযোগ নয়, সমস্যার সমাধান হোক। এখন দেখার বিষয়, তিন বছরের দায়িত্বে মিফতাহ্ সিদ্দিকী সেই প্রত্যাশাকে কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন।

 

আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।