ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স।
প্রবাসমুখী এক জনপদ সিলেট। আর এই সিলেটের অসংখ্য মানুষ প্রতিবছর জীবিকার তাগিদে কিংবা পরিবারের ভাগ্য বদলের আশায় পাড়ি জমান যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, কানাডাসহ ইউরোপে। আর মানুষের সেই প্রবাসমুখী স্বপ্নকে পুঁজি করে সিলেটে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালচক্র। বিদেশে পাঠানোর কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া, ভুয়া জাল ভিসা ও কাগজপত্র ধরিয়ে দেওয়া কিংবা টাকা হাতিয়ে নিয়ে অফিস গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো অভিযোগ একের পর এক সামনে আসছে। কখনো কখনো মধ্যপ্রাচ্য থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে ইউরোপে রওনা দিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। উন্নত জীবনের আশায় ভিটেমাটি বিক্রি করে দালাল কিংবা ট্রাভেল এজেন্সির কাছে দেওয়া টাকা ফিরে না পেয়ে প্রতারণার শিকার অনেক পরিবার এখন দিশেহারা।
সর্বশেষ সিলেটের গোলাপগঞ্জে যুক্তরাজ্যে হেলথ কেয়ার ভিসায় পাঠানোর কথা বলে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কয়েছ আহমদ (৪০) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৯। রবিবার (১৬ আগস্ট) রাতে গোলাপগঞ্জের রায়গড় পুরান বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব জানায়, একটি প্রতারকচক্র যুক্তরাজ্যের হেলথ কেয়ার ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে মোট ৬০ লাখ টাকা নেয়। মেডিকেলসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও দীর্ঘদিনে ভিসা না হওয়ায় ভুক্তভোগীদের সন্দেহ হয়। পরে কাগজপত্র যাচাই করে সেগুলো জাল ও ভুয়া বলে জানতে পারেন তারা। টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কয়েছকে গ্রেফতার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে র্যাব।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার নামে কোটি টাকা আত্মসাতের আরেক মামলায় বদরুজ্জামান তানভীরকে বুধবার (১২ আগস্ট) কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। জামিনের শর্ত পূরণ না করায় আদালত এ নির্দেশ দেন। মামলার বাদীপক্ষের দাবি, বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তানভীরসহ সংশ্লিষ্টরা মোট ১ কোটি ৪৭ লাখ ৪৩ হাজার ৩০৮ টাকা নেন। এর মধ্যে ৪৫ লাখ ২০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হলেও এখনো ১ কোটি ২ লাখ ২৩ হাজার ৩০৮ টাকা পাওনা রয়েছে। পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে গত ২৯ মে ইউরোপে পাঠানোর নামে সিলেটের ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’-এর বিরুদ্ধে প্রায় ৭০০ তরুণের কাছ থেকে অন্তত ৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির দুই মালিক জাবের আহমদ ও ইমন উদ্দিন বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নেন। পরে ভুয়া ভিসা দেখানো হয় এবং টাকা ফেরত চাইলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তারা। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির অফিস বন্ধ করে মালিকরা গা-ঢাকা দেন। পরে এ ঘটনায় মামলা হলে দুজনকে আটক করে পুলিশ।
গত সোমবার (৩ আগস্ট) রাতে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে। এই ৩৮ জনের মধ্যে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের কয়েকজন আছেন। একই সঙ্গে অন্তত সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।
এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাত যুবক। এদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলার পাগলা শত্রুমর্দনের হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন এবং রনসী গ্রামের মো. তালহা। ধারণা করা হচ্ছে, নিহত কয়েকজন যুবকের বাড়ি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। তবে এখনো তাদের বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোকে জানান, খাবার ও পানির সংকটে তাদের চোখের সামনেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। মরদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন তারা।
এদিকে ইউরোপের আশায় প্রতারণার শিকার হয়েছেন সিলেট নগরীর বাসিন্দা চৌধুরী মুশফিক মুনিমও। পরিচিত চারজনকে বিদেশে পাঠানোর জন্য তিনি ‘ট্রাভেল জোন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কয়েকদিন পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে জানানো হয়, সবার ভিসা হয়ে গেছে। পরে কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে মুনিম জানতে পারেন, সেগুলো ভুয়া। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি তাঁর কাছ থেকে ৭৮ লাখ টাকা নিয়েছে।
প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রাভেল জোনের স্বত্বাধিকারী নুরুল মুজতবা চৌধুরীর কাছে টাকা ফেরত চান মুনিম। কিন্তু টাকা ফেরত দিতে পারবেন না জানিয়ে তাকে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। পুলিশি তৎপরতায় পরে অভিযুক্তকে আটক করা হয়।
সিলেটে এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো, আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাব দেওয়া, ভিসা ও নিয়োগপত্রের কাগজ দেখানো-এভাবে বিভিন্ন কৌশলে বিদেশগামীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতারণার পর অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা অফিস বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছেন। এতে অর্থ হারানোর পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নও ভেঙে পড়ছে ভুক্তভোগীদের।
চৌধুরী মুশফিক মুনিম বলেন, ‘ট্রাভেল জোন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচিত চারজনকে বিদেশে পাঠানোর জন্য কথাবার্তা চূড়ান্ত করি। কয়েকদিন পর কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে তারা জানায়, ভিসা হয়ে গেছে। এরই মধ্যে আমাদের কাছ থেকে ৭৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে কাগজপত্র যাচাই করে জানতে পারি, সেগুলো ভুয়া। এরপর প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে টাকা ফেরত চাইলে তিনি টাকা দিতে পারবেন না বলে জানান। পরে তিনি বলেন, আপনার কাছে ডকুমেন্ট আছে তো? আপনি মামলা করেন।’
সিলেটের সচেতন নাগরিকরা জানান, বিদেশ যাওয়ার আগে রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা যাচাই না করাই প্রতারণার অন্যতম বড় কারণ। তাই টাকা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি বিএমইটির অনুমোদিত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে ভিসা, নিয়োগপত্রসহ সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র আইনগত ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত থানায় মামলা ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
ট্রাভেল এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আটাব) সিলেট জোনের তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, ‘সিলেটে বৈধ এজেন্সির সংখ্যা প্রায় ২০০ হলেও নামে-বেনামে গড়ে ওঠা অবৈধ এজেন্সির সংখ্যা অন্তত ১ হাজার। ফলে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন যেন প্রতারণার দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়, সেজন্য বিদেশগামীদের নিজেদেরও সতর্ক হতে হবে। টাকা দেওয়ার আগে এজেন্সির বৈধতা, ভিসা ও চাকরির কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি লেনদেনের যথাযথ প্রমাণ রাখতে হবে।’
সিলেট জজ কোর্টের আইনজীবী সামশুল আবেদীন বলেন, ‘সিলেটে বৈধ এজেন্সির সংখ্যা ২০০ হলেও অবৈধ এজেন্সি আছে আরও প্রায় ১ হাজার। টাকা দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন যাচাই এবং প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ প্রতারিত হওয়ার মূল কারণগুলোর একটি হলো লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি করা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে আরও নজর দেওয়া জরুরি।’
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সিলেটে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে পাঠানোর নামে ভুয়া ভিসা ও বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রতারণার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অবৈধ এজেন্সি ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বিদেশগামীদেরও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কথায় টাকা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বৈধতা, ভিসা ও চাকরির কাগজপত্র যাচাই করে লেনদেনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-০৮
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.