প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:২০ (শনিবার)
জুরী নদী নৌকাবাইচ ট্রাজেডির ৪৩ বছর

আজ (২১ আগস্ট) মৌলভীবাজারের জুড়ীতে জুরী নদী নৌকাবাইচ ট্রাজেডির ৪৩ বছর। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের এদিন নদীতে নৌকাবাইচ চলাকালে দর্শকের চাপে মেরামতাধীন সেতু ভেঙ্গে পড়ে ৫ জন নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হন। কয়েকজনের কোনো সন্ধান মিলেনি।
 

এই দিনটিকে স্থানীয় শোক দিবস ঘোষণা ও নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন ভাইহারা পরিবার।

নিহতদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার (বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা) কুলাউড়া থানার (বর্তমান জুড়ী উপজেলা) জায়ফরনগর ইউনিয়নের কামিনীগঞ্জ বাজার সংলগ্ন খর¯্রােতা জুরী নদী ও তার শাখা কন্টিনালা নদীতে প্রতি বছর নৌকাবাইচের আয়োজন হত। দুর-দুরান্ত থেকে আগত ময়ূরপঙ্খী সাজে সজ্জিত বাহারী রঙ্গের নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। মহকুমার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ নৌকাবাইচ দেখতে এখানে এসে জড়ো হতেন। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে এ সময় স্থানীয়দের মাঝে উৎসব আমেজ বিরাজ করতো। স্থানীয় ভোগতেরা গ্রামের ফখর উদ্দিন ও রজব আলীসহ কয়েকজন সৌখিন উদ্যোক্তা প্রতি বছর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালের ২১ আগস্ট রবিবার রজব উদ্দিন একক ভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। চুড়ান্ত দৌঁড়ে তিনটি নৌকা উত্তীর্ণ হয়। ততক্ষণে নদীর দুই তীর প্রায় দুই কিলোমিটার লোকারণ্যে পরিণত। কন্টিনালা নদীর উপর জুড়ী-ফুলতলা সড়কে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলে নির্মিত লোহার সেতুটির তখন ভগ্নদশা। মেরামত কাজ চলছিল। যানচলাচল সম্পূর্ন বন্ধ ছিল। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও মানুষের অবস্থানের ফলে সেতুতে তিল ঠাই ছিল না। বিকেল ৫টায় শুরু হয়েছে চুড়ান্ত দৌঁড়। হঠাৎ করে আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত বিকট শব্দ। পলকে সেতুটি উধাও। লোকজনসহ হারিয়ে যায় পানির গহীনে। শুরু হয় আহাজারী, কান্নার রোল। পারে থাকা লোকজন যে যার মত করে নেমে পড়েন উদ্ধার কাজে। নৌকা, কলাগাছ ও বাঁশের ভেলায় করে শিশু, যুবক ও বৃদ্ধসহ অসংখ্য মানুষকে উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসক ও কুলাউড়া হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। অনেকেই ছিলেন নিখোঁজ।
 

পরবর্তীতে নদীসহ হাকালুকি হাওরে ভাসমান অবস্থায় কামিনীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আক্কেল আলীর পুত্র সহিদুল ইসলাম ফয়সল (১১), পশ্চিম ভবানীপুরের তমছির আলীর পুত্র ময়না মিয়া (১১), ভোগতেরা গ্রামের মাওলানা চাঁন মিয়ার পুত্র ছালাম মিয়া (২২), ভবানীপুরের ছিটু গাজীর পুত্র তাজুল ইসলাম (১৫), ভবানীগঞ্জ বাজারের মছব্বির আলীর পুত্র মিছবাহ উদ্দিন (১১) সহ কয়েকজন মারা যান এবং সাগরনাল ইউনিয়নের কাশিনগর গ্রামের মখলিছ মিয়া (২৫) সহ কয়েকজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে সেতুর নিচে চাপা পড়া অনেককে উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি।
 

নৌকাবাইচের কারণে সেতু ভেঙ্গে মানুষ আহত, নিহত ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি তখন আয়োজক ‘রজবের গজব’ নামে মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল। আনন্দের নৌকাবাইচটি পরিণত হয় বিষাদে। সেই থেকে আজ ৪৩ বছর। এ দীর্ঘ সময়ে জুরী নদীতে আর নৌকাবাইচ না হলেও মানুষের মন থেকে সেই ট্রাজেডি এখনও মুছে যায়নি। ভয়াবহ সে দিনক্ষণের কথা মনে হলে আজো লোকজন আঁতকে উঠেন।

নিহত সহিদুল ইসলাম ফয়সল এর ভাই খায়রুল ইসলাম ফুল ও নিহত ময়না মিয়া এর ভাই আব্দুল মতলিব নৌকাবাইচ কেন্দ্রীক সেতু ভেঙ্গে নিহতদের স্মরণ, বিয়োগান্তক ঘটনার স্মৃতি সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের জ্ঞাতার্থে অকুস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা ও ২১ আগস্টকে স্থানীয় শোকদিবস ঘোষণার দাবি জানান।
 

প্রত্যক্ষদর্শী সেলিম আহমদ, আবুল কালাম গেদু বলেন, ‘চোখের পাতা ফেলতে না ফেলতেই মানুষজনসহ সেতুটি হারিয়ে যায়। বিভীষিকাময় সে ঘটনার স্মৃতি ৪৩ বছরেও মানুষ ভুলতে পারেনি।’

যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সহিদ চৌধুরী খুশী দাবীর প্রতি একাত্বতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ওই সময় আবেদনের মাধ্যমে সিলেট জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে নিহত তিনজনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল।’


উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার, অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক বীরমুক্তিযোদ্ধা কুলেশ চন্দ্র চন্দ মন্টু বলেন, ‘সেতু ভাঙ্গার প্রায় ১০ মিনিট পূর্বে সেতু থেকে বহু শিশুকে নামিয়ে এনেছিলাম, নতুবা মৃত্যু বা নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তো। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা ও ২১ আগস্টকে স্থানীয় শোকদিবস ঘোষণার দাবী অত্যন্ত যৌক্তিক।’

দাবীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাছুম রেজা বলেন, ‘পরিষদের সভায় আলোচনা করে এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/মঞ্জুরে/এসডি-০১