প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:৫১ (শনিবার)
স্মৃতিতে আজও অমলিন নায়করাজ রাজ্জাক

ষাটের দশকে বাংলা সিনেমা যখন উর্দু, কলকাতার বাংলা ও হিন্দি সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল, তখন হঠাৎ জহির রায়হানের হাত ধরে বাংলা সিনেমায় আগমন ঘটে নায়করাজ রাজ্জাকের।
 

১৯৬৮ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ সিনেমার মাধ্যমে সিনেমা জগতে পূর্ণাঙ্গ অভিষেক ঘটে রাজ্জাকের। এর আগে সহকারী পরিচালক ও পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করলেও ‘বেহুলা’ আব্দুর রাজ্জাক নামের সাধারণ এক অভিনেতার নামের সঙ্গে নায়কের তকমা জুড়ে দেয়। তারপর একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নায়করাজ। বাংলা সিনেমায় তিনি রাজত্ব করেন পাঁচ দশক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ৫০০-এর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। নায়করাজ রাজ্জাকের জন্ম কলকাতায়। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি। তার প্রকৃত নাম আব্দুর রাজ্জাক। টালিগঞ্জের মোল্লা বাড়ির আকবর হোসেন ও মা মিনারুন্নেসার ছোট ছেলে তিনি। জন্মের পর কলকাতায়ই বেড়ে উঠেছেন। ছোটবেলায় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেন অভিনেতা।
 

শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক ‘বিদ্রোহীতে’ গ্রামের কিশোর চরিত্রের মধ্য দিয়ে অভিনয়ে যুক্ত হন। কিন্তু অভিনয় করার ইচ্ছা থাকলেও প্রধান বাধা ছিল তার পরিবার। পরিবারের কেউ চাননি তিনি অভিনয় করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে রাজ্জাক ছিলেন সবার ছোট। বড় দুই ভাই ব্যবসা করছেন, তাই তাকেও সেটি অনুসরণ করতে হবে। এটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। পরে মেজো ভাইয়ের সাহায্যে অভিনয় জগতে আসার সব সহযোগিতা পান রাজ্জাক। এসএসসি পাস করার পর রাজ্জাক নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। নিজের প্রতিভার গুণে ধীরে ধীরে ছোট পর্দার নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে যান। ওই সময়ই রাজ্জাক কলকাতার নামকরা নাট্যাভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
 

অভিনয়ের অধ্যায় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের আরেকটি অধ্যায় শুরু করেন তিনি। ১৯৬২ সালে লক্ষ্মীর সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬৪ সালে রাজ্জাক কলকাতা থেকে স্ত্রী লক্ষ্মী ও ছয় মাসের ছেলে বাপ্পারাজকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে তিনি থিয়েটারে কাজ শুরু করেন। থিয়েটারের কাজ করার পাশাপাশি সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।

দুবছর টিভি নাটকের অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন। সে সময় তিনি ‘ঘরোয়া’ নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকের নজরে আসেন। তবে সিনেমা বা নায়ক হওয়ার যে স্বপ্নবাসনা ছিল রাজ্জাকের তা পূরণ হয় ১৯৬৮ সালে। জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্বিতীয় সিনেমা ‘আনোয়ারা’ আর তৃতীয় ‘আগুন নিয়ে খেলা’।
 

তিন সিনেমা দিয়েই তিনি সুপারস্টার খেতাবে ভূষিত হন। ক্যারিয়ারে পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন রাজ্জাক। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ সিনেমার গল্পই তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। বাংলার পাশাপাশি উর্দু সিনেমাও রয়েছে তার ক্যারিয়ারে। নায়ক হিসাবে রাজ্জাক সর্বশেষ অভিনয় করেন ১৯৯৪ সালে ‘অন্ধবিশ্বাস’ সিনেমায়। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর বিরতি নেন। ফিরে আসেন সুপারহিট ‘বাবা কেন চাকর’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশি সিনেমার পাশাপাশি তখন তিনি কলকাতার সিনেমায়ও অভিনয় করা শুরু করেন। ঢাকা ও কলকাতা—দুই ইন্ডাস্ট্রির সিনেমায় তিনিই ছিলেন নায়করাজ।

ব্যক্তিগত জীবনে রাজ্জাকের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। এক মেয়ে মারা গেছেন। বড় ছেলে জনপ্রিয় অভিনেতা বাপ্পারাজ ও ছোট ছেলে অভিনেতা সম্রাট। সিনেমা জীবনে তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে রাজ্জাক জাতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৭ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ২১ আগস্ট পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন নায়করাজ রাজ্জাক। আজ তার নবম মৃত্যুবার্ষিকী। এদিনে তার ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীসহ সিনেমা অঙ্গনের মানুষ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তার শূন্যস্থান কখনোই পূরণ হওয়ার নয় বলেও মনে করে থাকেন সিনেমাসংশ্লিষ্টরা।
 

রাজ্জাক অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে—‘আবির্ভাব’, ‘বেঈমান’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘অলংকার’, ‘অবকাশ’, ‘অবুঝ মন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘আশার আলো’, ‘অশিক্ষিত’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চোখের জ্বলে’, ‘ছন্দ হারিয়ে গেলো’, ‘কাঁচ কাটা হিরে’, ‘কাজল লতা’, ‘কে তুমি’, ‘মানুষের মন’, ‘মাটির ঘর’, ‘মায়ার বাঁধন’, ‘মধুর মিলন’, ‘মনের মত বউ’, ‘রংবাজ’, ‘ময়নামতি’, ‘নাচের পুতুল’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ওরা এগারো জন’, ‘নতুন পৃথিবী’, ‘অমর প্রেম’, ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘পরিচয়’, ‘প্রতিশোধ’, ‘পুত্রবধূ’, ‘সমাপ্তি’, ‘স্বরলিপি’, ‘সংসার’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘সোনালী আকাশ’ প্রভৃতি।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৩