প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০০ (বুধবার)
সিলেটে যে রোগ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগ ‘নিধিরাম সর্দার’

ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স।

হাসপাতালে ঠাঁই নেই। একশ’ শয্যার হাম ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন দেড়শতাধিকের কাছাকাছি রোগী। প্রতিদিন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে শতাধিক শিশু। প্রতিদিনই ঘটছে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। গেল এক মাসে সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৩৭ জন। অর্থাৎ গড়ে একজনের বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে গেল একমাসে। এই অবস্থায় অনেকটা ‘নিধিরাম সর্দার’ হয়ে পরিস্থিতির দিকে চেয়ে আছে স্বাস্থ্য বিভাগ। দায়সারা টিকা ক্যাম্পেইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের কার্যক্রম। হাম প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা ও মায়েদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে না ভাবলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

চলতি বছরের মার্চ থেকে সিলেটে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। মে মাস থেকে প্রকোপ বাড়তে থাকে। আর জুন থেকে পরিণত হয় ‘হটস্পটে’। গেল প্রায় তিন মাস থেকে প্রায় প্রতিদিনই শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকে। এর মধ্যে হামের টিকার ক্যাম্পেইন সম্পন্ন হলেও কমেনি প্রকোপ। হাম ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়াদের চিকিৎসার জন্য একশ’ শয্যার শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ডেডিকেটেড করা হয়। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮ শয্যার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডটিও হামের চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড করেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দিনকে দিন আক্রান্তের সংখ্যা এতোই বাড়তে থাকে যে, রোগীর সংখ্যা শয্যা ছাড়িয়ে যায়।

 

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী- গেল ২৪ ঘন্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হন ৭১ জন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২০ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৩ জন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চারজন ভর্তি হয়েছেন। 

 

বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে ২৯৩ জন ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১১৭ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯৬ জন চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল দুটিতে শয্যার বেশি রোগী হওয়ায় এক শয্যায় একাধিক শিশু রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে চারজন, বিয়ানীবাজার ও জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইজন করে, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৩১ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নয়জন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৭ জন ভর্তি রয়েছেন। 

 

এদিকে, মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মারা গেছে ১৪৫ জন। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসেব অনুযায়ী সিলেটে সন্দেহজনক হাম রোগে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু চারজনের। হবিগঞ্জে সন্দেহজনক হাম রোগে ১৫ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে চারজন, মৌলভীবাজারে যথাক্রমে ১২ ও একজন এবং সুনামগঞ্জে ৫৬ ও একজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু ১৩৫ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু ১০ জন, অর্থাৎ মোট মৃত্যু ১৪৫ জন।

 

এদিকে, সিলেটে দিনকে দিন হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ঘটা করে ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত টিকা ক্যাম্পেইন করে প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনার ঘোষণা দিলেও হামের সংক্রমণ বাড়ার পর এর বাস্তবতা মিলছে না। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের ২০-২৫ ভাগ শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছেন। বর্তমানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদেরকে ধরে টিকা খাওয়ানো ছাড়া হাম নিয়ন্ত্রণে অন্য কোন কর্মসূচি নেই স্বাস্থ্যবিভাগের। ‘বাড়তে বাড়তে এক সময় কমে যাবে’- এমন ভরসায় তারা চেয়ে আছেন পরিস্থিতির দিকে। 

 

এ প্রসঙ্গে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন জানান, ঢাকা ছাড়া সারা দেশে হামের প্রকোপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে সিলেটে এখনো প্রকোপ চলছে। প্রতিদিনই শিশু মারা যাচ্ছে। হাম নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দিচ্ছে। এতোদিন মনে হচ্ছিল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে হয়ত শতভাগ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা দেখছেন প্রতি ২০ জনে অন্তত ৪-৫ জন শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। 

 

সিভিল সার্জন আরও বলেন, ৯ ও ১৫ মাস বয়সে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু ৯ মাসের আগেই অনেক শিশু আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এসব শিশু মায়েদের কাছ থেকে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পাওয়া কথা। কিন্তু তারা কেন পাচ্ছে না- এটা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ভাবতে হবে।

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ শাদিআচৌ/ এহিয়া-০৯