প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০০ (শনিবার)
১০০ টাকায় পাওয়া যাবে যে দেশের ‘অফার লেটার’

ছবি: ফাইল ছবি।

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামের কোনো এক উঠানে, কিংবা শহরের ছোট্ট এক ঘরে, ঘুম ভাঙছে এক নারীর। প্রতিদিনের মতো আজও হয়তো তার সামনে সংসারের অগণিত কাজ। সন্তানের প্রিয় মুখ, পরিবারের দায়িত্ব, রান্নাঘরের ব্যস্ততা, জীবনের ছোট-বড় নানা হিসাব। কিন্তু সেই চেনা দিনের ভেতর আজ হয়তো একটি অচেনা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, জীবনের গল্পটা কি একটু বদলানো যেত? যদি দূর কোনো দেশে গিয়ে নিজের শ্রমে পরিবারের স্বপ্নটাকে আরেকটু বড় করা যেত? যদি সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটু বেশি সঞ্চয় করা যায়? যদি নিজের জীবনের সীমারেখার পরিধিটা একটু দূরে টেনে দেওয়া যায়?

 

বাংলাদেশের অসংখ্য নারীর হৃদয়ে এমন স্বপ্ন হয়তো নীরবে জন্ম নেয়। কেউ তা বলেন, কেউ বা বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখেন। সেই নীরব স্বপ্নের সামনে এবার খুলেছে নতুন একটি দরজা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় হংকংয়ে ১৪৪ জন নারী গৃহকর্মী নিয়োগের সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)।

 

স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটি একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি পারে কিন্তু কারো কাছে এটি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি সুযোগ, কারো কাছে পরিবারের দীর্ঘদিনের অভাবের বিরুদ্ধে নতুন করে দাঁড়ানোর সাহসের ঢাল, আবার কারো কাছে দূরদেশে পাড়ি জমানোর আগে দেখা এক নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

 

এই যাত্রার গল্পটা বিমানবন্দরের কোলাহল দিয়ে শুরু হবে না । শুরু হবে একটি কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোনের ছোট্ট পর্দা থেকে। নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন করতে হবে আগ্রহী প্রার্থীদের। তবে এই সুযোগের দরজা সবার জন্য সমানভাবে খোলা নয়। আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২২-৪৫ বছরের মধ্যে। থাকতে হবে গৃহকর্মের কাজে অন্তত দুই বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি ক্যান্টনিজ অথবা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতাও প্রয়োজন।

 

অর্থাৎ শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না। সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করাতে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, ভাষা বোঝার সক্ষমতা এবং সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি। একটি অনলাইন ফরম পূরণ করার মধ্য দিয়ে তাই শুরু হবে এক নারীর সম্ভাব্য নতুন জীবনের প্রথম অধ্যায়।

 

দূর হংকংয়ে গিয়ে দিনের পর দিন শ্রম দেওয়ার বিনিময়ে নির্বাচিত একজন কর্মী মাস শেষে পাবেন ৫ হাজার ১০০ হংকং ডলার বেতন। দুই বছরের শ্রমচুক্তির আওতায় মিলবে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

 

সংখ্যাটি হয়তো কাগজে-কলমে একটি বেতনমাত্র। কিন্তু একজন নারীর জীবনে এর অর্থ আরও অনেক গভীর। এই অর্থ দিয়ে হয়তো কোনো মা-সন্তানের স্কুলের বেতন দেবেন। কোনো মেয়ে বাবার চিকিৎসার খরচ পাঠাবেন। কেউ হয়তো ভাঙা ঘরের চাল মেরামত করবেন। কেউ বা প্রতি মাসে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে একদিন নিজের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন।

 

বিদেশের মাটিতে উপার্জন করা প্রতিটি অর্থ তখন শুধু টাকা থাকবে না; হয়ে উঠবে ঘরের মানুষের মুখে একটু স্বস্তির হাসি, সন্তানের হাতে নতুন বই, কিংবা বহুদিনের অপূর্ণ কোনো স্বপ্ন পূরণের ছোট্ট সিঁড়ি।

 

বিদেশে কাজের ক্ষেত্রে শুধু বেতনই শেষ কথা নয়। অচেনা দেশে একজন কর্মীর নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নির্বাচিত কর্মীদের থাকা-খাওয়া এবং বিমানভাড়ার ব্যয় বহন করবেন নিয়োগকর্তা। শ্রমচুক্তির মেয়াদ হবে দুই বছর। সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতে হবে। পাশাপাশি হংকংয়ের শ্রম আইন অনুযায়ী চিকিৎসা, বিমা, ছুটি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে। বিদেশের অচেনা শহরে পা রাখার পর একজন নারী কর্মীর জন্য এসব সুবিধা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্নের সঙ্গে যেমন থাকে ভালো উপার্জনের প্রত্যাশা, তেমনি থাকে নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নও।

 

অনলাইনে আবেদন করলেই অবশ্য হাতে চলে আসবে না হংকংয়ের টিকিট। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের ডাকা হবে সাক্ষাৎকারে। সেই সাক্ষাৎকারই হতে পারে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতু।

 

সেখানে একজন নারীকে তুলে ধরতে হবে নিজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও যোগ্যতা। সঙ্গে রাখতে হবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রÑ মূল পাসপোর্ট, ইংরেজি জীবনবৃত্তান্ত, অভিজ্ঞতার সনদসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি।

 

তবে প্রাথমিক নির্বাচন কিংবা সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া মানেই চাকরি নিশ্চিত নয়। চূড়ান্ত নিয়োগ হবে নিয়োগকর্তার সাক্ষাৎকার ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ এই যাত্রায় প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভুল তথ্য, একটি অসম্পূর্ণ কাগজ কিংবা অসতর্কতার একটি মুহূর্তও হয়তো স্বপ্নের পথকে থামিয়ে দিতে পারে।

 

এই দীর্ঘ যাত্রার শুরুতে আবেদন ফি মাত্র ১০০ টাকা। নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন করার সময় বিকাশের মাধ্যমে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আবেদনের শেষ সময় ২৫ আগস্ট ২০২৬।

 

একশ টাকা হয়তো অনেকের কাছে সামান্য। প্রতিদিনের জীবনের হিসাবের ভিড়ে এটি হয়তো খুব বড় কোনো অঙ্কও নয়। কিন্তু কখনো কখনো সামান্য অর্থের বিনিময়েই শুরু হয় বড় কোনো স্বপ্নের যাত্রা।

 

একজন নারীর হাতে থাকা সেই একশ টাকা হয়তো কেবল আবেদন ফি নয়। সেটি হতে পারে নিজের ভাগ্যকে একটু অন্যভাবে লেখার প্রথম সাহস। একটি ফরম, একটি সাক্ষাৎকার, একটি সুযোগÑ এরপরই হয়তো বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের গল্প।

 

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন যত বড়, প্রতারণার ঝুঁকিও তত বাস্তব। বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য দালালচক্রের ফাঁদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারণার জাল বিছিয়ে বসে থাকা মানুষও কম নেই।

 

এই জায়গাতেই সতর্ক করেছে বোয়েসেল। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বোয়েসেল কোনো নগদ অর্থ গ্রহণ করে না। বিদেশে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তাদের কোনো এজেন্ট, সাব-এজেন্ট, প্রতিনিধি বা শাখা অফিস নেই। নির্ধারিত সার্ভিস চার্জের বাইরে কেউ অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে সতর্ক থাকতে হবে।

 

তাই হংকং যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কোনো অচেনা দালালের দরজায় নয়, প্রার্থীদের হাঁটতে হবে সরকারি নির্ধারিত পথেই। কারণ একটি ভুল পদক্ষেপে যেমন স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে, তেমনি সঠিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া একজন নারীকে পৌঁছে দিতে পারে তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে।

 

হংকংয়ে ১৪৪ জন নারী যাবেন- সংখ্যাটি হয়তো বড় কোনো পরিসংখ্যান নয়। কিন্তু এই ১৪৪টি আসনের পেছনে থাকতে পারে ১৪৪টি পরিবার, ১৪৪টি সংগ্রাম, ১৪৪টি অপেক্ষা এবং ১৪৪টি স্বপ্ন।

 

কারো স্বপ্ন সন্তানের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া। কারো স্বপ্ন পরিবারের দীর্ঘদিনের ঋণ শোধ করা। কারো স্বপ্ন বাবা-মায়ের মুখে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। আবার কারো কাছে বিদেশে কাজ মানে নিজের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করা।

 

প্রতিটি গল্প আলাদা। প্রতিটি জীবনের হিসাব আলাদা। কিন্তু তাদের স্বপ্নের কেন্দ্রে হয়তো একই আকাক্সক্ষা নিজের শ্রমের বিনিময়ে নিজের এবং পরিবারের জীবনটাকে একটু ভালো করা। এই ১৪৪ জনের প্রত্যেকেই যখন একদিন বিমানে উঠবেন, তখন হয়তো তাদের চোখে থাকবে অজানা শহরের কৌতূহল, বুকের ভেতর থাকবে প্রিয়জনকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, আর তারও গভীরে থাকবে একটি দৃঢ় প্রত্যয়Ñ এই যাত্রা শুধু আমার নয়, আমার ঘরের মানুষেরও।

 

বাংলাদেশি নারী কর্মীদের জন্য হংকংয়ের এই সুযোগ তাই কেবল একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য কিছুটা কমিয়ে দেখা হবে। এটি নতুন একটি শ্রমবাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। আজ যে নারী হয়তো গ্রামের একটি ছোট্ট ঘরে বসে মোবাইলের পর্দায় আবেদনপত্র পূরণ করবেন, কয়েক মাস পর তিনিই হয়তো বিমানের জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখবেন বাংলাদেশের পরিচিত মাটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।

 

সামনে থাকবে নতুন শহর। নতুন মানুষ। নতুন ভাষা। নতুন কাজ। নতুন দায়িত্ব। আর পেছনে থাকবে একটি পরিচিত উঠান, সন্তানের মুখ, মা-বাবার চোখ, স্বজনদের ভালোবাসা আর একটি দেশের মাটি। দূর হংকংয়ের পথে সেই নারীর যাত্রা তখন আর কেবল একজন কর্মীর বিদেশযাত্রা থাকবে না। হয়ে উঠবে একটি পরিবারের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় হংকংয়ের ব্যস্ত নগরীর আলো-ঝলমলে পথের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ফোন করবেন দেশের বাড়িতে। ওপাশ থেকে সন্তানের কণ্ঠ ভেসে আসবে, ‘মা, তুমি কবে আসবে?’ তিনি হয়তো একটু নীরব থেকে বলবেন, ‘আরও কিছুদিন। তোমাদের জন্যই তো এসেছি।’

 

সেই মুহূর্তেই বোঝা যাবে, বিদেশে পাড়ি জমানোর গল্পের আড়ালে আসলে লুকিয়ে থাকে কত নারীর নিঃশব্দ আত্মত্যাগ, কত পরিবারের স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার আকাক্সক্ষা। হংকংএ যাওযার এই সুযোগ তাই একটি পরিবারের নতুন অধ্যায়ের শুরু। আর একটি ছোট্ট অনলাইন আবেদন, হয়তো হয়ে উঠতে পারে সেই নতুন গল্পের প্রথম বাক্য।

 

আবেদন করবেন যেভাবে-
বোয়েসেলের অনলাইন নিয়োগ পোর্টালে নিজের ব্যক্তিগত ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে প্রোফাইল সম্পন্ন করুন। বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া কাগজপত্র ও তথ্য আপলোড করে আবেদন জমা দিন। দালালের মাধ্যমে আবেদন করবেন না; সরাসরি বোয়েসেলের সরকারি পোর্টাল ব্যবহার করুন।


আবেদনের শেষ সময়-
২৫ আগস্ট ২০২৬ বিকেল ৪টা।

আবেদন পোর্টাল : https://brms.boesl.gov.bd

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-১০