প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:০০ (শুক্রবার)
সিলেট সীমান্তের এপারে জিরো টলারেন্স, ওপারে ‘ওপেন’!

সিলেটের উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্য। মেঘালয় রাজ্যটির সীমান্ত পাহাড়ি এলাকা। মেঘালয় রাজ্য বরাবর সিলেট ও সুনামগঞ্জ সীমান্ত প্রকৃত অর্থে মাদকের ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’। 

 


সীমান্তের ওপারে ইয়াবা-ফেনসিডিলসহ তরল মাদকের কারখানা থাকায় সেখান থেকে ভারতীয় চোরাই পণ্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত আসছে মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, এপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করা হলেও ওপারে ঠিক তার উল্টো। সেখানে মাদকবাণিজ্য অনেকটা ওপেন সিক্রেট। সে কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

 

মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে সরকারঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি এখন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সমন্বিতভাবে সারা দেশে এই বিশেষ অভিযান চলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার বিধানও রয়েছে। বর্তমানে মাদক-সংক্রান্ত সব অপরাধের বিচার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসি পর্যন্ত হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও চোরাচালান বা মাদকের বিস্তার কমানো যাচ্ছে না।

 


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রথম তফসিলে মাদককে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণিতে আছে সবচেয়ে ভয়ংকর মাদক। যেমন হেরোইন, কোকেন, ইয়াবা, পেথিডিন, আফিম, কোকাগাছ, প্রিকারসর কেমিক্যালস। এই শ্রেণির জন্য শাস্তি সবচেয়ে বেশি। ‘খ’ শ্রেণিতে গাঁজা, ভাং, চরস ইত্যাদি। ‘গ’ শ্রেণি হলো অ্যালকোহল, বিয়ার, দেশি মদ, রেকটিফায়েড স্পিরিট ইত্যাদি।

 

 

‘মেঘালয় ট্রানজিট’ পর্যবেক্ষণ সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তের ওপারের এলাকা আসাম রাজ্যের অধীন। সেখান থেকেও মাদক চোরাচালান হয়। তবে সেখানে পাহাড়ি এলাকা না থাকায় মাদক চোরাচালানের রাশ ওঠানামা করে। ‘মেঘালয় ট্রানজিট’ থেকে সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট এবং সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, মধ্যনগর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) যথেষ্ট কড়া নজরদারি রয়েছে। তার পরও মাদক চোরাচালান থামছে না। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মেঘালয় ট্রানজিটে মাদকের চোরাচালান বেশি হয়েছে হাওর এলাকাকে টার্গেট করে। এর মধ্যে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার ছাড়াও মেঘালয় ট্রানজিটের রুট হচ্ছে জাফলং, বিছনাকান্দি, কালাইরাগ, মহেষখলা, কাইটাকোনা, কড়ইবাড়ি, গঙ্গানগর, ঘিলাগড়া, বাঙালভিটা। 

 


এপারে জিরো টলারেন্স থাকলেও ওপারে ওপেন সিক্রেট হওয়ায় ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা দোয়ারাবাজার উপজেলায় মাদক সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হচ্ছে। চোরাচালানে ব্যবহৃত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাবাজার ইউনিয়নের কলাউরা (১২৩৬ নং পিলার), শিমুলতলা, বাঁশতলা, পেকপাড়া, বোগলাবাজার ইউনিয়নের বাগানবাড়ি, গাছগড়া, ইদুকোনা, লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ভাংগাপাড়া, মাঠগাঁও, দৌলতপুর এবং নরসিংপুর ইউনিয়নের শ্যামারগাঁও (১২৩৯ নং পিলার), শ্রীপুর (১২৪০ নং পিলার) ও চাইরগাঁও (১২৪১ নং পিলার)।

 

 

মাদকের ‘মেঘালয় ট্রানজিট’ মোকাবিলায় সক্রিয় রয়েছে বিজিবির ৪৮ ও ৩৮ ব্যাটালিয়ন। ‘মেঘালয় ট্রানজিটে’ ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার ৭ কিলোমিটার নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নে এবং ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ২৩ কিলোমিটার সিলেট ব্যাটালিয়নের অন্তর্ভুক্ত। এর বাইরে ৯০ কিলোমিটার সীমান্ত সুনামগঞ্জ বিজিবির ২৮ ব্যাটালিয়নের অধীন। সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন ৯০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৮৯ কিলোমিটার স্থলসীমা ও ১ কিলোমিটার জলসীমা। সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকা। কিছু কিছু স্থান কাঁটাতারের বেড়াবিহীন রয়েছে।

 

 

তবে ‘মেঘালয় ট্রানজিট’ বিষয়টি মানতে নারাজ ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নাজমুল হক। মেঘালয় ও আসাম সীমান্ত দিয়ে মাদক আসা রোধে প্রধান ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থান মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল এবং আসামের নদী-সমতল এলাকার সংযোগস্থলে হওয়ায় সীমান্তের কিছু দুর্গম অংশ দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে মাদক প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। তথাপিও ভারত থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে মাদকদ্রব্য যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য বিজিবি সর্বদা সতর্ক ও তৎপর রয়েছে। বিগত দুই বছরের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান ও জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ পর্যালোচনায় সিলেটকে মাদকদ্রব্যের উল্লেখযোগ্য প্রবেশপথ বা অন্যতম ট্রানজিট রুট হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।’

 


২৮ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল জাকারিয়া কাদির বলেন, ভারত থেকে অবৈধভাবে চোরাচালানের মাধ্যমে আনা মালামাল প্রতিরোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বদা সীমান্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। সীমান্তে কার্যকর নজরদারি ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি স্থলপথের পাশাপাশি নদীপথেও নিয়মিত টহল দেয়। বিজিবির আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নতুনভাবে সংযোজিত ড্রোনের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও চোরাচালান প্রতিরোধ কার্যক্রম অধিকতর কার্যকর হচ্ছে। কিন্তু ওপার অনেকটা অনিয়ন্ত্রিত থাকায় সমন্বিত পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ ডেস্ক