প্রতীকী ছবি
কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামির কনডেম সেলে থাকার কথা, তাদের অনেকেই দুই বছরের বেশি সময় মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মৃত্যুর বিভীষিকায় আচ্ছন্ন কারাগারের চার দেয়ালের বন্দিজীবনে না ফিরতে গাঢাকা দিয়ে রয়েছেন তারা। অথচ জেল পলাতক সেসব আসামির অনেকেরই এত দিনে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা।
আবার অনেকের চরম উৎকণ্ঠায় ফাঁসির প্রহর গুনতে গুনতে সৃষ্টিকর্তার কাছে পাপমোচনের দোয়া চাইতে থাকার কথা। স্বজন হারানো অনেক পরিবার শেষ সান্ত্বনা হিসেবে হয়তো দীর্ঘ বছর ধরে অপেক্ষা করছিল এসব আসামির মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ পাওয়ার। কিন্তু এই আসামিরা কোথায় আছেন, কেউ দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন কি না-এর সঠিক কোনো তথ্য নেই কারও কাছে।
কারা সূত্র বলছে, একাধিক কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৯৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে ৪৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৫২ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
জানা গেছে, পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কেউ হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি, কেউ সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত, আবার কারও বিরুদ্ধে রয়েছে জঙ্গিবাদের অভিযোগ। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ছোট কাজরা গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (৩০) তেমনি একজন। গণ অভ্যুত্থানের সময় গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে সংঘটিত দাঙ্গা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনি অন্যান্য বন্দিদের সঙ্গে কারাগারের দেয়াল টপকে পালিয়ে যান। রাজধানীর মতিঝিলের একটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন তিনি। প্রায় দুই বছর মুক্ত বাতাসে ঘোরার পর তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।
একই কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের আব্দুল্লাহ শিকদার। সুদের টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীকে হাতুড়িপেটা ও পরে কুপিয়ে হত্যার দায়ে আব্দুল্লাহ এবং তার তিন সহযোগীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে তাকে রাখা হয়েছিল হাই সিকিউরিটি কারাগারে। আব্দুল্লাহ শিকদারও গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে যারা পলাতক রয়েছে তারা মোয়াজ্জেম ও আব্দুল্লাহ শিকদারের চেয়েও দুর্ধর্ষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলাতকদের অনেকে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছেন, নিয়মিত অবস্থান বদলাচ্ছেন এবং আত্মগোপনে থাকতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। তাই তাদের খুঁজে বের করা সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং কারা অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ’২৪-এর জুলাই-আগস্টের সেই অস্থির সময়ে দেশের অন্তত ১৭টি কারাগারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। কোথাও বাইরের হামলায় নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, কোথাও আবার ভিতরের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই ধারাবাহিক ঘটনার সুযোগে কারাগার থেকে পালিয়ে যায় দুই হাজারের বেশি বন্দি। তাদের মধ্যে ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত বন্দিরা। অর্থাৎ যাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়, তাদের একটি অংশই কারাগারের বাইরে চলে যায়।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সেই সময় ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে যান। যাদের মধ্যে ৬৯০ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ জন বন্দির মধ্যে ১৬৬ জনের কোনো পরিচয় বা নথিপত্র কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। এ ছাড়া বিভিন্ন কারাগার থেকে নয়জন জঙ্গি সদস্য পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও তিনজন পলাতক রয়েছেন। আর এখনো যারা পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ ৫২ জনের অবস্থান কোথায়, সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই। তাদের কেউ কেউ ফাঁসি কার্যকর হওয়ার ভয়ে দেশ ছেড়েছেন বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে পালিয়ে যায় ২০২ জন বন্দি। তাদের মধ্যে ৮৮ জনই ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের মধ্যে ৯৮ জন ছিলেন জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে অভিযুক্ত। এদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ৯ জনের চারজন ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। পরে ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও বাকি ৭০ জনের কোনো হদিস মেলেনি। এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর জামিন পাওয়া ৩৮০ জনও আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) তথ্য অনুযায়ী, জেএমবির ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হিযবুত তাহ্রীরের ৫৯ জন, হুজি-বির ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, আল্লাহর দলের ৯ জন, জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১ জন এবং ইমাম মাহমুদের কাফেলার একজন সদস্য পলাতক রয়েছেন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা উদ্ধারের ঘটনায় জামিনে বের হওয়া ও জেল পলাতক কয়েক জঙ্গির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যা জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে।
কারা অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে লুট হয় ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৮ হাজার ১৫ রাউন্ড গুলি। পরে ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এখনো উদ্ধার হয়নি ২৭টি অস্ত্র এবং ৬ হাজার ৩৫২ রাউন্ড গুলি।
অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অধরা থাকা জেল পালানো আসামিদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে ফেরানোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ দেখছি না। কারণ যে যত বড় অপরাধী সে তত গোপনে থাকার চেষ্টা করবে। অনেকে জেল থেকে পালানোর পরই দেশ ছেড়েছে বলে ধারণা করা হয়। আবার অনেকে আত্মগোপন অবস্থায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই বন্দিরা যত দিন বাইরে থাকবে তত দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটবে না। সেই সঙ্গে সবাইকে ফেরানো না গেলে একটি খারাপ উদাহরণ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে গণ অভ্যুত্থ্যান বা জনগনের কোনো আন্দোলনে একই পরিস্থিতি আসলে একই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকবে।
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, কারাগার থেকে পালানোর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেককেই গ্রেপ্তার করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে অন্য কাজও অনেক বেড়ে গেছে। এতে অনেক বন্দি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকা উচিত। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে কাজে লাগালে সবচেয়ে বেশি কাজে দিতে পারে। একই সঙ্গে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে।
কারা অধিদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, বন্দি পালানোর ঘটনার পরেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে কারা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিতই হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরা হয়। পুলিশও তাদের তৎপরতার তথ্য তুলে ধরে। পুলিশের ভাষ্য হচ্ছে, পলাতক দুর্ধর্ষ বন্দিরা বারবার অবস্থান বদল করায় তারা সবাইকে গ্রেপ্তার করতে পারছে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কারাগার থেকে বন্দিরা পালানোর পর থেকেই এন্টি টেররিজম ইউনিটকে (এটিইউ) বিশেষভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটি শুরু থেকেই নিবেদিতপ্রাণ হয়ে বন্দি গ্রেপ্তারে কাজ করছে। অনেককে গ্রেপ্তারও করেছে। শুধু এটিইউ নয়, অন্য সংস্থাও বন্দিদের গ্রেপ্তার করছে। যারা এখনো অধরা রয়েছে তাদের গ্রেপ্তারে নিয়মিতই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৮
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.