আমি একজন চা-প্রেমী মানুষ। চা ছাড়া যেন আমার চলেই না। শুধু আমি নই—আমার মতো এ দেশের কোটি কোটি মানুষ চা ভালোবাসেন। রাজনীতির টেবিল থেকে শুরু করে অফিসের আড্ডা—সবখানেই এক কাপ চা যেন আমাদের সংস্কৃতির অংশ।
কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, এই এক কাপ চায়ের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার চা শ্রমিকের ঘাম ও কঠোর পরিশ্রম? চা-বাগানে প্রতিদিন অসংখ্য নারী-পুরুষ শ্রমিক সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করেন। তাঁদের শ্রমে শুধু আমাদের চায়ের চাহিদাই পূরণ হয় না, সমৃদ্ধ হয় দেশের অর্থনীতিও।২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৩৫ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ৬ হাজার টাকা।কিন্তু এই বিশাল উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অবদানের বিপরীতে চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। এত অল্প আয়ে বর্তমান সময়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো কতটা কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অন্যদিকে, ২০১৫ সালের পর প্রায় দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’ অনুমোদন হয়েছে। তাঁদের বেতন বৃদ্ধি করা যৌক্তিক, কারণ এই সময়ে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—দ্রব্যমূল্য কি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেড়েছে? না, সবার জন্যই বেড়েছে। তাহলে দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরি পাওয়া চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি কেন যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে না?
সম্প্রতি চা শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করছেন। আমার দৃষ্টিতে, এটি কোনো অযৌক্তিক দাবি নয়; বরং একজন শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের ন্যায্য দাবি।
যে শ্রমিকের ঘামে আমাদের প্রতিদিনের এক কাপ চা তৈরি হয়, তাঁর নিজের জীবন যদি দারিদ্র্য ও বঞ্চনায় আটকে থাকে, তাহলে সেই চায়ের স্বাদে কোথাও না কোথাও আমাদের বিবেকের প্রশ্ন থেকেই যায়।
চা শ্রমিক শুধু শ্রমের বাহক নন; তিনি একজন মানুষ, একজন বাবা, একজন মা—যাঁরও স্বপ্ন আছে, অধিকার আছে, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাই রাষ্ট্রের উচিত চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।
আমরা যখন পরবর্তীবার এক কাপ চা হাতে নেব, তখন যেনো একবার ভাবি—এই চায়ের পেছনে যে মানুষের ঘাম রয়েছে,তাঁর জীবনের মূল্য কি আমরা যথাযথভাবে দিচ্ছি?এক কাপ চায়ের মূল্য নির্ধারিত হোক শুধু টাকায় নয়—ন্যায্যতা, মানবিকতা ও শ্রমের মর্যাদায়।
লেখক: আরিফ রশিদ, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.