দীর্ঘ চার দশক পর আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উদ্বোধন করবেন ড. খলিলুর রহমান। এর আগে সকাল ১১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা) ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন বিদায়ী সভাপতি ও জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক। এরপর তার কাছ থেকে সভাপতির দায়িত্ব বুঝে নেবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর মধ্য দিয়ে ৪০ বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ পদে আবারও কোনো বাংলাদেশি বসছেন। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
যেভাবে সভাপতি নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান:
চলতি বছরের ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন ড. খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরের সাধারণ পরিষদ হলে অনুষ্ঠিত গোপন ব্যালটের ভোটে তিনি ৯৯ ভোট পান। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিস পান ৯১ ভোট।
জাতিসংঘের আঞ্চলিক পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থার আওতায় এবার সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল। সেই হিসেবে বাংলাদেশ প্রার্থী দেয় ড. খলিলুর রহমানকে।
তার নির্বাচনের পর চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ অভিনন্দন জানায়। চীন তার নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করে। ভারতও অভিন্ন অগ্রাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
অন্যদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন উপ-প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত ট্যামি ব্রুস বলেন, সংকটময় সময়ে ড. খলিলুর রহমান এই দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। জাতিসংঘের সংস্কার, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় সংস্থাটির কার্যকারিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তার নিরপেক্ষ নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক বছর দায়িত্ব পালন করবেন ড. খলিলুর রহমান। এ সময়ে তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের কার্যক্রমে সভাপতিত্ব করবেন এবং বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন।
আগামী ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেবেন। গুরুত্বপূর্ণ এসব কার্যক্রমে সভাপতি হিসেবে মূল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবেন ড. খলিলুর রহমান।
৮১তম অধিবেশন শুরুর আগে সোমবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ড. খলিলুর রহমান। এ সময় মহাসচিব নবনির্বাচিত সভাপতি হিসেবে তার নতুন দায়িত্বের জন্য শুভেচ্ছা জানান।
সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সংকট ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে সাধারণ বিতর্ক। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা নিজ নিজ দেশের অবস্থান ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে বক্তব্য দেবেন। ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর চলবে উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ।
এ ছাড়া উন্নয়নের অধিকারবিষয়ক ঘোষণার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বৈঠক, মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে এসব বৈঠকে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। একই সময়ে নিউইয়র্কজুড়ে বিভিন্ন সরকার, জাতিসংঘের সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য অংশীদার সংগঠনের উদ্যোগে নানা সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে।
৮১তম অধিবেশনে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়ন, বৈষম্য কমানো, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নির্ধারিত ১৭টি লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন করে গতি আনার চেষ্টা করবেন বিশ্বনেতারা।
১৯ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘গ্লোবাল গোলস উইক’ অনুষ্ঠিত হবে। এতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, নাগরিক সমাজ, ব্যবসা ও শিক্ষাঙ্গনসহ ১০০টির বেশি অংশীদার যুক্ত থাকবে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে যাচ্ছে সংস্থাটির পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মহাসচিব পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব নেবেন।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। সদস্যরাষ্ট্রগুলো প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার পর প্রার্থীরা সদস্যরাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদ অনানুষ্ঠানিক ভোট বা ‘স্ট্র পোল’-এর মাধ্যমে প্রার্থীদের প্রতি সদস্যদের সমর্থন যাচাই করছে।
পরবর্তী ধাপে নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে। এরপর সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে অনুমোদন দিয়ে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেবে।
ড. খলিলুর রহমান এমন এক সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, মানবিক সংকট এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকট বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের নিরপেক্ষতা, কার্যকারিতা ও সংস্কার নিয়ে নানা প্রশ্নও রয়েছে। ফলে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতির দায়িত্ব শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পদ নয়, বরং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চার দশক পর বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৯
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.