প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩৫ (বুধবার)
আটান্ন বছর পরেও ফুরিয়ে যায়নি 'Friends Not Foes' এর আবেদন

পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইউব খান ১৯৬৭ সালে প্রকাশ করেন ২৬৩ পৃষ্ঠার ‘Friends Not Masters: (A Political Autobiography) শিরোনামের এক বই।

রাজনৈতিক আত্মজীবনীমূলক এই বইটি তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে অনুলেখক হিসেবে লিখে দেন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্য সচিব  আলতাফ গওহর নামের এক আমলা। বইটি বাধ্যতামূলক ভাবে পাঠ্যবই করা হয়েছিল ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি পর্যায়ে।

জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসার পর পাঠ্যবইয়ের তালিকা থেকে সেটা বাদ দেওয়া হয়। আইউব খান এই বইয়ে নিজের ক্ষমতা দখল ও স্বৈরাচারী শাসনকে বৈধ প্রমাণ করার অপচেষ্টায় বাঙালিদের খাটো ও অবমূল্যায়ন করেন। তিনি লিখেন," East Bengalis, who constitute the bulk of the population, probably belong to the very original Indian races. It would be no exaggeration to say that up to the creation of Pakistan, they had not known any real freedom or sovereignty. (অনুবাদ : পূর্ব বঙ্গীয়রা, যারা জনসংখ্যার সিংহভাগ, তারা সম্ভবত একদম আদি ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এটা বললে কোনো অতুক্তি হবে না যে, পাকিস্তানের সৃষ্টি পর্যন্ত তারা কোনো প্রকৃত স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের স্বাদ পায়নি।)

সামরিক জান্তা আইউব খানের বইয়ে এধরণের আপত্তিকর, অসভ্য ও বর্ণবাদী বক্তব্য সমুহের  জবাব দিয়ে ও পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্যে তুলে ধরে মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে ১৯৬৮ সালের প্রথম ভাগে সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য  এডভোকেট এম মজিবর রহমান (রাজশাহী) এম.এ. এল.এল.বি.  ঢাকা থেকে প্রকাশ করেন ২০২ পৃষ্ঠার এক বই— ‘Friends Not Foes:( A Political Survey of Pakistan).
এডভোকেট এম মজিবর রহমান তাঁর বইয়ে রাজনৈতিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আইউব খানের বাঙালি-বিদ্বেষী বক্তব্যের দাঁতভাঙা জবাব দেন।  তিনি লিখেন, "Nature and climate of East Pakistan had made them (Bengalis) freedom-loving and many Royel Princes of the Delhi Sultanate had come to Bengal in the past as Governors under the Delhi empower and permanently settleld here, declared their independence and were assimilated with the local  people. Such was the influence of the geography and climate of the provence. Their love for independence was so much high and aggressive that could never reconcile themselves to the British rule and never shouldered the British guns to deprive other Nations of their freedom. (পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃতি ও জলবায়ু তাদের (বাঙালিদের) স্বাধীনচেতা করে তুলেছিল এবং অতীতে দিল্লি সালতানাতের অনেক রাজপুত্র দিল্লির সম্রাটের অধীনে গভর্নর হিসেবে বাংলায় এসে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন, নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং স্থানীয় জনগণের সাথে মিশে গিয়েছিলেন। এটি ছিল প্রদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর প্রভাব। স্বাধীনতার প্রতি তাদের ভালোবাসা এতটাই প্রবল ও তীব্র ছিল যে তারা কখনোই ব্রিটিশ শাসনকে মেনে নিতে পারেনি এবং অন্য জাতির স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য কখনো ব্রিটিশদের অস্ত্র কাঁধে তুলে নেয়নি।)

আইউব খান তাঁর বইয়ের মূল ফোকাস "প্রভু নয়, বন্ধু" হবার যে কথা লিখেছেন তা শুধুই অসার ও বাস্তববিবর্জিত। সেই সম্পর্কে এডভোকেট মজিবুর রহমান লিখেন -"The central ruling elite of Pakistan preaches equality and friendship to the outer world, but practices absolute mastership and internal colonization over the majority population of East Pakistan." (অনুবাদ: পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী বহির্বিশ্বের কাছে সমতা ও বন্ধুত্বের প্রচার করে কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উপর নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব ও অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ স্থাপন করে।)

এডভোকেট এম মজিবুর রহমান আরো লিখেন," People, politicians and political parties are not foes of the state, but are friends. Their interests are not mutually exclusive and antagonistic but are both complementary and supplementary. (অনুবাদ: জনগণ, রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রের শত্রু নয়, বরং বন্ধু। তাদের পারস্পরিক স্বার্থ একে অপরকে বর্জন করে নয় কিংবা তারা একে অপরের বিরোধী নয়, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক ও সহায়ক।)" 
বইটিতে ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের এক নিখুঁত রাজনৈতিক সমীক্ষা (Political Survey) তুলে ধরেন।  একই সাথে আইউব খানের "বেসিক ডেমোক্রেসি" বা মৌলিক গণতন্ত্র নামক প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কুৎসিত রূপটিও উন্মোচন করেন। আইউব খান  বলতেন যে,  প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ভোটাধিকার পাকিস্তানের তৎকালীন অশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে অসচেতন জনসাধারণের জন্য উপযুক্ত নয়। তাঁর শাসন কালে সাধারণ জনগণ সরাসরি প্রেসিডেন্ট বা আইনসভার সদস্যদের ভোট দিতে পারতেন না। তারা কেবল স্থানীয় পর্যায়ের ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্যদের নির্বাচিত করতেন। পরে এই সদস্যরাাই প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতেন। এটাই তাঁর প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্র। আইউব খান বইয়ে লিখেন -At this stage, I felt that I should have a mandate from the people to continue in my task. It was therefore decided that before the election results of Basic Democracies were announced, I should take the opportunity of seeking a vote of confidence from the 80,000 Basic Democrats. So that I might be able to give the country a Constitution under a mandate from the people." (অনুবাদ : এই পর্যায়ে, আমি অনুভব করলাম যে আমার কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণের কাছ থেকে একটি জনমত বা অনুমোদন (ম্যান্ডেট) পাওয়া উচিত। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, মৌলিক গণতন্ত্রের (Basic Democracies) নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করার আগেই, আমি যেন ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী সদস্যের কাছ থেকে একটি আস্থাভোট (vote of confidence) নেওয়ার সুযোগটি গ্রহণ করি, যাতে আমি জনগণের দেওয়া সেই আদেশের (ম্যান্ডেট) ভিত্তিতে দেশকে একটি সংবিধান দিতে সমর্থ হই।)
আইউব খান প্রবর্তিত গণতন্ত্র সম্পর্কে এডভোকেট মজিবুর রহমান লিখেন -Basic Democracy is neither basic nor democracy; it is a tightly controlled system devised to freeze the political and economic rights of the Bengalis." (অনুবাদ : মৌলিক গণতন্ত্র মৌলিকও নয়, আবার গণতন্ত্রও নয় ; এটি একটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা যা বাঙালিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার স্থগিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।)

এডভোকেট এম মজিবুর রহমান দেশের বিভিন্ন সমস্যা শুধু  তুলেই ধরেননি তার সমাধানের পথও দেখিয়েছিলেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল তাঁর দূরদর্শিতা—তিনি স্পষ্ট সতর্কবাণী দিয়েছিলেন যে, বাঙালির স্বাধিকারের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে যদি জোর করে দমন করার চেষ্টা করা হয়, তবে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে যাবে। এই সত্য উচ্চারণ এশিয়ার ‘লৌহমানব’ খ্যাত সামরিক জান্তা আইউব খানসহ তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের ঘুম হারাম করে দেয়।

বইটি প্রকাশের কয়েকমাস পরেই ১৯৬৯ সালে ২৪ মার্চ ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতি আইউব খান সেনা প্রধান জেনারেল  আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা দিয়ে সরে যেতে বাধ্য হন। তারই ধারাবাহিকতায় বাতিল হয়ে যায় আইউবের তথাকথিত ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’। প্রতিষ্ঠিত হয় প্রকৃত গণতন্ত্র—‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ নীতি। যার ওপর ভিত্তি করে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয় আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

এডভোকেট  এম. মজিবর রহমানের মতো বীর বাঙালিদের এই ধরণের শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল একটি আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল দুই দশক ধরে চলা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও তাত্ত্বিক লড়াই। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা বিরোধীগোষ্ঠী বাঙালি বিদ্বেষী স্বৈরশাসক আইউব খানের আমলের তথাকথিত "উন্নয়ন"-এর কথা বলে স্বৈরতন্ত্রের গুণগান করে মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করতে চায়। এতে তারা আসলে ইতিহাসের এই গভীর ক্ষতগুলোকে এড়িয়ে নিজের জাতিসত্ত্বাকেই খাটো করে ফেলে। আইউব খানের  Friends Not Master’s  শিরোনামে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই এবং তার প্রতিবাদে লেখা এডভোকেট এম মজিবুর রহমান (রাজশাহী) এর Friends Not Foes বই  প্রমাণ করে যে, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। এটা যারা অস্বীকার করে তাদেরকে কিছু বলার ভাষা আমার জানা নেই।
 

লেখক: প্রফেসর ড. ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস, প্রাক্তন উপাচার্য, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। অধ্যাপক গণিত বিভাগ  ও প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট।