প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:৪২ (বৃহস্পতিবার)
সিলেটের ‘গরীবেরবন্ধু’ একজন আবদুল জব্বার জলিল

বিপদগ্রস্থ মানুষ আসতেন বড় ভাই খলিলুর রহমানের কাছে। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ সন্তানের পড়াশোনা বা জরুরি প্রয়োজনে। সামর্থ্যের সীমা ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব। নিজের পকেট শূন্য করে বিলিয়ে দেওয়ার মতো উদারতা ছিল তাঁর। বড় ভাইয়ের সেই মানবিকতা গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল আবদুল জব্বার জলিলকে। মানুষের অসহায়ত্ব তাঁকেও ভাবাত। তখনই সংকল্প করেছিলেন- স্বাবলম্বী হয়ে মানুষের জন্য কাজ করবেন, পাশে দাঁড়াবেন অসহায়দের।
 

সময়ের সঙ্গে সেই সংকল্পই পরিণত হয়েছে দীর্ঘ মানবসেবার অভিযাত্রায়। ব্যবসায়িক জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজের সম্পদের একটি বড় অংশ ব্যয় করছেন মানুষের কল্যাণে। গড়ে তুলেছেন ‘আবদুল জব্বার জলিল কল্যাণ ট্রাস্ট’। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগকালীন ত্রাণ এবং অসচ্ছল মানুষের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা- বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি মানুষ ট্রাস্টের সেবার আওতায় এসেছেন। সর্বশেষ চলতি বছরের আগস্ট থেকে উপার্জনহীন অসহায় নারী-পুরুষের জন্য শুরু হয়েছে ‘মাসিক ভাতা’ কার্যক্রম। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশত মানুষ এই কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। ভাতার ব্যপ্তি সহস্রাধিকে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন তাঁর।
 

সাঁকো থেকে সেতু, যেখান থেকে শুরু : 
সমাজসেবায় আবদুল জব্বার জলিলের আনুষ্ঠানিক হাতেখড়ি ছাত্রজীবনেই। তখন তিনি এমসি কলেজের ছাত্র। নিজ এলাকা দক্ষিণ সুরমার জালালপুর ইউনিয়নের বৈরাগীবাজারে বড়ভাগা খালের ওপর ছিল বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার হয়ে বাজারে যাতায়াত করতেন স্থানীয়রা। মানুষের দুর্ভোগ তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। কয়েকজন বন্ধু নিয়ে উদ্যোগ নেন বৈরাগীবাজার পরিচ্ছন্নতার। হাটের পরদিন তাঁরা বাজার পরিচ্ছন্ন করতেন। বিনিময়ে পরবর্তী হাটের দিনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের কাছ থেকেও সহায়তা নেন। এভাবে সংগৃহীত প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বড়ভাগা খালের ওপর নির্মাণ করেন পাকা সেতু। সেই সেতু নির্মাণ যেন তাঁর সমাজসেবার পথচলায় একটি বাঁকবদল। স্থানীয় একটি সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে বৃহত্তর মানবসেবায়।
 

শিক্ষা বিস্তারে আলোর দিশারী : 
আবদুল জব্বার জলিলের সমাজসেবার বড় একটি ক্ষেত্র শিক্ষা। ১৯৮৫ সালে স্থাপিত বৈরাগীবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম তিনি। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে চারশ শিক্ষার্থী অধ্যয়ণরত। জালালপুর কলেজ এবং জালালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে দুটি ভবন। দক্ষিণ সুরমা কলেজের অডিটোরিয়ামও হয়েছে তাঁর অর্থায়নে। এ ছাড়া রুস্তুমপুর উচ্চ বিদ্যালয়, বিবিদইল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি ইনক্লুসিভ স্কুল, হাজীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ ও জালালপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর অনুদান রয়েছে। নিজের মায়ের নামে দক্ষিণ সুরমার সুনামপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সায়রা খাতুন হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা’। সম্পূর্ণ অবৈতনিক আবাসিক মাদ্রাসাটি পরিচালনা করছে তাঁর ট্রাস্ট।

বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও দাতা হলেও পরিচালনা পর্ষদে থাকার আগ্রহ নেই তাঁর। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কর্তৃত্বের চেয়ে দূর থেকে সহযোগিতা করেই তৃপ্তি পান তিনি। ট্রাস্টের সহযোগিতায় নার্সিং ও কারিগরি শিক্ষা লাভ করেছে অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী। শিক্ষাখাতে তাঁর সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক।
 

করোনাকালে ছুটেছেন অক্সিজেন নিয়ে: 
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল করোনাভাইরাস মহামারি। মানুষ যখন ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছিল, তখন নিজে ফুসফুসের রোগী হয়েও অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে অসুস্থ মানুষের বাড়ি বাড়ি ছুটেছেন আবদুল জব্বার জলিল। করোনাক্রান্ত রোগীদের কাছে যখন অক্সিজেন সিলিন্ডার ‘সোনার হরিণ’ তখন তাঁর ট্রাস্ট শুরু করে ‘ফ্রি অক্সিজেন সেবা’। ওই সময়ে প্রায় ১২শ’ রোগী এই সেবা নেন। মহামারি শেষ হলেও বন্ধ হয়নি উদ্যোগটি। এখনো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে চলমান আছে ফ্রি অক্সিজেন সেবা।
 

গৃহহীন ১৮০ পরিবারে পাকাঘর:
অসহায় মানুষের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করাও আবদুল জব্বার জলিলের সমাজসেবার অন্যতম দিক। ট্রাস্ট সূত্র জানায়, দক্ষিণ সুরমার ৪৪টি গ্রামের দুই শতাধিক মানুষকে ঘর নির্মাণের জন্য তিনি ঢেউটিন দিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার ১৮০টি পরিবার পেয়েছেন পাকাঘর। দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসাসেবা কিংবা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খাদ্যের প্রয়োজন- সাধ্যমতো এসব ক্ষেত্রেও সহায়তা দিয়েছেন তিনি।
 

চিকিৎসায়ও সহযোগিতা: 
দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায় আবদুল জব্বার জলিলের সম্পৃক্ততা পুরোনো। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রায় একযুগ বৈরাগীবাজারে পরিচালনা করেছেন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। শহরের বস্তিবাসীর জন্যও পরিচালনা করেছেন ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এ ছাড়া ইতোমধ্যে কয়েকশ দরিদ্র রোগী চিকিৎসার জন্য পেয়েছেন অর্থ সহায়তা। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা কার্যক্রম সচল রাখতে তিনি ১৪টি ফিল্টার দেন। চিকিৎসার পাশাপাশি অসহায় রোগীদের ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনেও সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন তিনি।
 

হুইল চেয়ার, কৃত্রিম অঙ্গ:
শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে পিছিয়ে পড়াদের জন্যও কাজ করেছে ট্রাস্ট। দরিদ্র পঙ্গু মানুষের মধ্যে হুইল চেয়ার বিতরণের পাশাপাশি কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজনের ব্যবস্থা করেছে আবদুল জব্বার জলিল কল্যান ট্রাস্ট। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত মানুষ হুইল চেয়ার কিংবা কৃত্রিম পা সংযোজনের সুযোগ পেয়েছেন।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে আবদুল জব্বার জলিল হাজারো শীতার্তদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করেন। ঈদুল ফিতরের আগেও অসচ্ছল ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয় আর্থিক উপহারের খাম। গত ঈদে ৮৬ জন ইমাম-মুয়াজ্জিন পেয়েছেন এই সহায়তা। এ ছাড়া অর্ধশতাধিক মসজিদ ও মাদ্রাসায়ও রয়েছে তাঁর অনুদান।
 

শুরু হয়েছে মাসিক ভাতা:
এককালীন সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে ট্রাস্টের কর্মকাণ্ডে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের আগস্ট থেকে উপার্জনহীন অসহায় নারী ও পুরুষের জন্য চালু করা হয়েছে মাসিক ভাতা। আর্থিক অবস্থাভেদে সর্বোচ্চ ১০ হাজার থেকে সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে উপকারভোগীদের। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ জন এই কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। জীবদ্দশায় এই তালিকা হাজারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আবদুল জব্বার জলিলের।
 

প্রচারবিমুখ হলেও পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি:
প্রচারবিমূখ হলেও দীর্ঘদিনের মানবসেবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন আবদুল জব্বার জলিল। ২০২০ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর তাঁকে জাতীয় মানবকল্যাণ পদকে ভূষিত করে। তবে পুরস্কার বা প্রচারের প্রতি একেবারেই অনাগ্রহ তাঁর। বরং নীরবে মানুষের জন্য কাজ করাকেই তিনি নিয়েছেন ব্রত হিসেবে। আবদুল জব্বার জলিল মনে করেন, মানুষের জন্য করা কাজের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি। লোক দেখানো দান-খয়রাতে প্রকৃত শান্তি নেই। তাই জীবনের বাকি সময়টুকুও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে চান তিনি। সৃষ্টির সেবায় তিনি খুঁজে ফিরেন স্রষ্টাকে।
 

ব্যবসা ও পরিবার : 
পেশায় ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার জলিল ‘যাত্রীক ট্রাভেলস’-এর স্বত্বাধিকারী। নগরের জেলরোড এলাকার আনন্দ টাওয়ার অ্যান্ড শপিং কমপ্লেক্সের চেয়ারম্যানও তিনি। দুই ছেলে ও তিন মেয়ের বাবা তিনি। বড় ছেলে মো. ইসমাইল রনি যুক্তরাজ্যের একটি ট্রেনিং সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর। ছোট ছেলে মো. ইব্রাহিম সানি কানাডায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বড় মেয়ে আসমা বেগম লিজা নিউইয়র্কের প্রেসবিটারিয়ান হাসপাতালের চিকিৎসক। দ্বিতীয় মেয়ে আয়শা নাসরিন জ্যোতি সিএসইতে অনার্স শেষ করে বর্তমানে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছেন। ছোট মেয়ে মাইশা নাসরিন তিথি সম্প্রতি কানাডা থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন।

ছাত্রজীবনে বাজার পরিষ্কার করে চাঁদা তুলে যে তরুণ বাঁশের সাঁকোর জায়গায় পাকা সেতু করেছিলেন, তাঁর সেই উদ্যোগ আজ বিস্তৃত হয়েছে হাজারো মানুষের জীবনে। কেউ পেয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই, কেউ চিকিৎসা সহায়তা, কেউ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। কেউ পেয়েছেন একটি হুইল চেয়ার, কেউ কৃত্রিম পা। আবার কোনো অসহায় মানুষ মাসের শেষে পাচ্ছেন বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বন। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া মানবিকতার সেই শিক্ষা এখনো বয়ে চলেছেন আবদুল জব্বার জলিল। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের ব্রত।
 


লেখক: মোহাম্মদ শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল, সম্পাদক ও প্রকাশক, সিলেটভিউ২৪ডটকম।