প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:৫০ (মঙ্গলবার)
বাকের ভাই: কাল্পনিক এক ফাঁ*সি*র অমর গল্প

১৯৯৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল বিখ্যাত ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’র শেষ পর্ব। যেখানে দেখানো হয়েছিল নাটকটির প্রধান ও জনপ্রিয় চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি। কাল্পনিক চরিত্রের ফাঁসির ঘটনাটি নিয়ে মূলধারার পত্রিকার প্রথম পাতায় খবর প্রকাশ হয়েছিল, এমনকি চল্লিশা পালন করার মতো অভূতপূর্ব ঘটনাও এই নাটকটিকে ঘিরেই ঘটেছিল।
 

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী সৃষ্টি বাকের ভাই। বাইরে থেকে ভবঘুরে ও গুন্ডা প্রকৃতির মনে হলেও, ভেতরে সে ছিল ন্যায়পরায়ণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অনড় প্রতিবাদী। গল্পে সে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মুনাকে ভালোবাসত। একে একে পরিবারের সবাইকে হারিয়ে মুনা যখন নিঃস্ব ও ভেঙে পড়েছিল, বাকের ভাই তখন তার আশ্রয় ও ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। মুনার হৃদয়েও ভালোবাসার অনুভূতির সঞ্চার হয়, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। একটি মিথ্যা মামলায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বাকের ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়।
 

নাটকটির মধ্য দিয়ে বাকের ভাই হয়ে ওঠেন দেশের প্রতিটি ঘরের নিজস্ব মানুষ। বাকের ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর তৈরি হয় এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। কাল্পনিক এই চরিত্রটির জীবন রক্ষায় সারা দেশের সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ঢাকা শহরসহ সারা দেশে একের পর এক মিছিল থেকে স্লোগান ওঠে: ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে!’, ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন, জবাব চাই জবাব চাই!’
 

বাকের ভাইয়ের ফাঁসি রদ করার আবেদন জানিয়ে হুমায়ূন আহমেদের কাছে আটশর বেশি চিঠি পাঠানো হয়। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীও নাটকের শেষের এই বিয়োগান্ত গল্পটি কিছুটা পরিবর্তন করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে হুমায়ূন আহমেদ তার শিল্পসত্তায় অনড় থাকেন, যা চরিত্রটিকে চিরস্মরণীয় করে তোলে।
 

জনরোষ এড়াতে অত্যন্ত গোপনে নাটকের শেষ পর্বের শুটিং শেষ করা হয়। গল্পে রাজস্বাক্ষী বদির মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণেই বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়েছিল। ২১ সেপ্টেম্বর রাতে শেষ পর্ব প্রচারের পর ক্ষুব্ধ ও আবেগপ্রবণ জনতা ‘বদি’ চরিত্রের অভিনেতা আব্দুল কাদেরের বাসায় ইট-পাটকেল ছোড়ে। হুমায়ূন আহমেদের বাসা ঘিরে রাখে বিক্ষুব্ধ মানুষ। সেদিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হুমায়ূন আহমেদ অভিনেতা কাদেরকে নিয়ে বাসা ছেড়ে অন্য জায়গায় আত্মগোপন করেছিলেন। পরে সাধারণ মানুষ বাকের ভাইয়ের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় চল্লিশাও পালন করে!
 

তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাকের ভাই আজও বেঁচে আছেন দর্শকের হৃদয়ে। বাকের ভাই, মুনা, বদি—প্রতিটি চরিত্রই হয়ে উঠেছে বাংলা নাটকের চিরসবুজ অধ্যায়। নতুন প্রজন্মও আজ সেই গল্পের কথা জানে, আর পুরোনো দর্শক এখনো আবেগ নিয়ে স্মরণ করেন সেই সময়কে, যখন একটি কাল্পনিক চরিত্রের জন্য পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৪