এ. জে লাভলু, বড়লেখা:: ‘আমাকে দেখতে এসো, জামিন করানোর ব্যবস্থা করো। এখানে আমার ভালো লাগছে না, খুব কষ্ট হচ্ছে।’-সাড়ে ১৪ বছর ধরে কারাগারে থাকা হুমায়ুন কবীর ওরফে এনামুলের লেখা ১৩ বছর আগের চিঠিতে ছিল এমন আকুতি। সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের প্রায় ছয় মাস পর কাশিমপুর কারাগার থেকে বাবা-মায়ের কাছে ওই চিঠি পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভয় আর আতঙ্কে পরিবারের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। জামিনের ব্যবস্থাও করেননি।
এখন সেই চিঠিই পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে দীর্ঘ অপেক্ষা আর আক্ষেপের স্মৃতি। চিঠিটি হাতে নিয়ে এনামুলের দুই মা ছেলের মুক্তির অপেক্ষায় চোখের পানি ফেলছেন। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা এনামুলের সঙ্গে দেখা করা বা তাঁর জামিনের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও তাঁদের নেই।
এনামুল হক ওরফে হুমায়ুন কবীর মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামের মৃত মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়ার ছেলে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ভবনে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এদিকে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় এনামুল আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবীরের সম্পৃক্ততার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই)। পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে কারাগারে থাকা এনামুল বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন।
এনামুলের বড় ভাই শাহীন আহমদ বলেন, গ্রেপ্তারের আগে তাদের বাবাকে ধরে নিয়ে প্রায় ২১ দিন নির্যাতন করা হয়েছিল। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আনুমানিক তিন-চার মাস পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে র্যাব এনামুলকে গ্রেপ্তার করে। নির্যাতনের কারণে তাঁদের বাবা গুরুতর আহত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করেও তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। ছয় মাস আগে তিনি মারা যান।
শাহীন আহমদ বলেন, এনামুলকে গ্রেপ্তারের প্রায় ছয় মাস পর কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাবার কাছে একটি চিঠি আসে। দুই পৃষ্ঠার ওই চিঠি বাবা তাঁকে দিয়ে পড়িয়েছিলেন। তবে চিঠির বিষয়টি কাউকে জানাতে নিষেধ করেছিলেন।
চিঠিতে যা লিখেছিলেন এনামুল:
চিঠির শুরুতে প্রিয় বাবা-মা সম্বোধন করে সালাম জানান এনামুল। এরপর লেখেন, বর্তমানে আমি কাশিমপুর কারাগারে পার্ট-১ পদ্মা ওয়ার্ডে রয়েছি। আমি জেলে আসার পর তোমরা কেউ দেখতে আসনি। বাবা, জেনে রাখ, আমি মামলার ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই। আমাকে অন্যায়ভাবে ধরা হয়েছে। চিঠিতে নিজের ভুলের জন্য বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমাও চান তিনি। লেখেন, আমি নিজেও তোমাদের সঙ্গে অনেক অন্যায় করেছি, তোমাদের কথা শুনিনি। আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই। বাবার কাছে জামিনের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়ে এনামুল আরও লেখেন, তোমাদের দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। আমাকে দেখতে এসো, জামিন করানোর ব্যবস্থা করো। এখানে আমার ভালো লাগছে না, খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি বের হলে তোমাদের অবাধ্য হব না, বাড়ি থেকে বের হব না।
এনামুলের ভাই শাহীন আহমদ বলেন, বাবার ভয় ছিল, যারা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তারা যদি জানতে পারে এনামুলের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে, তাহলে আবার তাঁকে কিংবা আমাদের কাউকে ধরে নিয়ে যেতে পারে। এ কারণে আমরা কেউ এনামুলের খোঁজ নিতে যাইনি। ওই ভয় থেকেই এনামুলকে দেখতে কারাগারে যাওয়া হয়নি। তাঁর জামিনের জন্য কোনো আইনজীবীও নিয়োগ করা হয়নি।
শাহীন বলেন, আমাদের দুজন মা। দুজনকেই আমরা মা বলে ডাকি। ১৩ বছর আগে এনামুল যে চিঠি পাঠিয়েছিল, এখন সেই চিঠি হাতে নিয়ে তাঁরা বিলাপ করেন। ছেলের মুক্তির অপেক্ষায় চোখের পানি ফেলেন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে এনামুলের সঙ্গে দেখা করা কিংবা তাঁর জামিনের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/এজেএল
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.