প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:১০ (বুধবার)
পা দিয়ে লিখে দাখিল পাস আশরাফের আকুতি, চাই কর্মসংস্থান

ছবি: সিলেটভিউ

দুই হাত নেই, কিন্তু স্বপ্ন দেখার সাহস হারাননি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পানিছড়া গ্রামের ১৮ বছর বয়সী আশরাফ মো. আলী হোসেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে পা দিয়ে লিখে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ২.৭৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এখন তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা—একটি কর্মসংস্থান, যার মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া।

 

আশরাফ মো. আলী হোসেন চিকনাগুল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পানিছড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা খলিল আহমদ এবং মা মোছা. আমিনা বেগম। তিনি সিলেটের চান্দু শাহ্ জামিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে এবারের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেন।


পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে দাদির সঙ্গে কানাইঘাটে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন আশরাফ। সেখানে একটি দুইতলা ভবনের ছাদ থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে যাওয়ার সময় নিজেকে রক্ষার জন্য তিনি ১১ কেভি বৈদ্যুতিক লাইনের তার ধরে ফেলেন। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

 

পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা জানান, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তাঁর দুই হাত মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। জীবন রক্ষার্থে হাত কেটে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে বলেও তাঁরা জানান।

 

প্রথমে পরিবার এতে রাজি না হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য আশরাফকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।

 

এই দুর্ঘটনা আশরাফের জীবনকে কঠিন করে তুললেও তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। দুই হাত হারানোর পর পা দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করেন তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে লেখাপড়া চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।


দুই হাত হারানোর পর আশরাফের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাঁর মা-ই প্রধান ভরসা। হাঁটাচলা করতে পারলেও বিভিন্ন কাজে তাঁকে সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। মাদ্রাসায় যাতায়াতের সময়ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।

 

আশরাফ বলেন, “আমি হাঁটাহাঁটি ও চলাফেরা করতে পারি। কিন্তু লেখাপড়া করতে মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় অনেকেই আমাকে অবহেলা করে গাড়িতে তুলতেন না। আমার সঙ্গে একজন সহকারী না থাকলে অনেক সময় চলাফেরা করা সম্ভব হতো না। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে আমি জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। আমি চাই অন্য সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে।”

 

নিজের পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার বাবা একজন নিম্ন আয়ের মানুষ। আমার চিকিৎসার পেছনে তিনি সর্বস্ব হারিয়েছেন। কিছুদিন আগে আমার বড় ভাইও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। দুই ছেলের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে বাবা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এখন আমি পরিবারের হাল ধরতে চাই।”


আশরাফের মামা মুহিব উল্লাহ জানান, দুর্ঘটনার পরও আশরাফ হাল ছাড়েননি। জীবনযুদ্ধে লড়াই করে পা দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

 

মুহিব উল্লাহ বলেন, “আশরাফ সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে আরও এগিয়ে যেতে পারবে। তাদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবারের সদস্যরা অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন। আশরাফের বাবা বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে চিকিৎসার খরচ চালিয়েছেন। পরিবারের আহার, চিকিৎসা ও লেখাপড়ার ব্যয় বহন করে ঋণ পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।”

 

তিনি আরও বলেন, আশরাফের বাড়ির কাছেই সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের প্রধান কার্যালয় রয়েছে। সেখানে তাঁর জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে বাড়ির কাছ থেকে যাতায়াত করে কাজ করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক দৃষ্টি কামনা করেন।

 

আশরাফের স্বপ্ন এখন স্বাবলম্বী হওয়া। পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সরকার তাঁকে একটি চাকরি দিলে তিনি নিজের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও নিতে পারবেন বলে আশা করছেন।

 

আশরাফ বলেন, “আমার শারীরিক অবস্থা ও পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাকে একটি চাকরি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে চাই।”

 

এ বিষয়ে তিনি সরকারের প্রধান এবং সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপির সুদৃষ্টি কামনা করেন।


চিকনাগুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, “একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনায় পরিবারটি আজ অসহায় জীবনযাপন করছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও সবাইকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”

 

স্থানীয়রা জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে আশরাফ যে সাহস ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন, তা অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর লেখাপড়া অব্যাহত রাখা, স্বাবলম্বী হওয়া এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন পূরণে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

 

আশরাফের প্রত্যাশা, সহানুভূতি নয়, একটি সুযোগ। একটি কর্মসংস্থানই হতে পারে তাঁর নতুন জীবনের পথচলার শক্তি। তিনি চান, নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকতে।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/জাহিদ/ইকে-০৯