পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, বইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা সৃষ্টি এবং তাদের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও প্রকাশক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলার্সহোম টিলাগড় ক্যাম্পাসে তিন দিনব্যাপী ‘স্কলার্সহোম বইমেলা ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আয়োজিত এই বইমেলার প্রতিপাদ্য ছিল— “পড়ো, ভাবো, পর্যালোচনা করো ও অনুপ্রাণিত হও”।
প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামছ উদ্দিন (আরণ্যক শামছ) এর বিশেষ পরিকল্পনা ও উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এ মেলায় শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বই প্রদর্শনী ও বিক্রয়, বই নির্বাচন, পাঠ-চ্যালেঞ্জ, শ্রেণিভিত্তিক বইমেলা পরিদর্শন এবং সর্বশেষ দিনে বুক রিভিউ ও টক শো। আয়োজনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আজীবন পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, মানসম্মত বই পড়ায় উৎসাহিত করা এবং বই পড়ে নিজের ভাবনা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা।
বর্ণাঢ্য উদ্বোধন:
২০ সেপ্টেম্বর বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর জয়নুল আবেদীন চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলার উদ্বোধন করেন। এ সময় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয় এক আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দের বই সংগ্রহ করে পাঠ-অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি বইকে ঘিরে নতুন করে ভাবার সুযোগ পায়।
বইমেলার দ্বিতীয় দিনে শিক্ষার্থীরা নির্বাচিত বই পড়া, বই বিশ্লেষণ এবং বুক রিভিউ উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেয়। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বই বিশ্লেষণ, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন এবং শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
২২ সেপ্টেম্বর: বুক রিভিউ ও টক শো
বইমেলার তৃতীয় ও সমাপনী দিনে আয়োজিত বুক রিভিউ ও টক শো ছিল পুরো আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। এদিন শিক্ষার্থীরা বইমেলা থেকে নিজেদের পছন্দ করে কেনা ও পড়া বই নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাদের বইয়ের কাহিনি, চরিত্র, প্রিয় অংশ, মূলভাব, নৈতিক শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত উপলব্ধি তুলে ধরে। বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। শিক্ষার্থীদের পাঠের প্রতি আগ্রহ, চিন্তার গভীরতা এবং নিজেদের মতামত প্রকাশের সাবলীলতা ছিল বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।
বুক রিভিউতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা:
বুক রিভিউ পর্বে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা হল—জশজিৎ দাস অগ্নি, মুনতাহা হোসেইন, ইজমা বিনতে ইকবাল, জাহরা আমানা খান, নাইরা মাহমুদ, আয়েশা রেশতিনা আফিফাহ, দেবনীল সাহা, সাইদা মাহরীন হোসেইন, শোয়াইব আহমদ তাকি, টিএম আল ইমরান আরাফাত, রুশদা রহমান, রাদওয়া সুহাদ চৌধুরী এবং সিদরাতুল মুনতাহা। তারা নিজ নিজ নির্বাচিত বইয়ের কাহিনি, চরিত্র, শিক্ষণীয় বিষয়, প্রিয় অংশ এবং বইটি পড়ে তাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধি অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করে।
নবীন ও শিশুলেখক দেবনীল সাহার বই নিয়ে ব্যতিক্রমী টক শো:
অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও শিশুলেখক দেবনীল সাহার নিজের লেখা বই ‘গুপ্তধনের খোঁজে’ নিয়ে বিশেষ টক শো— ‘একজন লেখকের দৃষ্টিতে’। একজন স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীর নিজের লেখা বইকে কেন্দ্র করে এমন একটি সৃজনশীল আয়োজন উপস্থিত সবার মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে। দেবনীল তার লেখালেখির অভিজ্ঞতা, বইটির ভাবনা এবং সৃষ্টির পেছনের গল্প নিয়ে কথা বলে। তার আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য, সৃজনশীলতা ও প্রাণবন্ত উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। টক শোটি অত্যন্ত দক্ষতা ও সাবলীলতার সঙ্গে সঞ্চালনা করেন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রুশদা রহমান। তার আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা, সুন্দর প্রশ্ন এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতা উপস্থিত সকলের প্রশংসা অর্জন করে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ড. তপন কুমার সাহা, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, সিলেট। তিনি কিশোর লেখক দেবনীল সাহার পিতা। সন্তানের এমন সৃজনশীল ও অসাধারণ অর্জনে তিনি গর্বিত এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দেবনীলের এই সাফল্যকে উৎসাহিত করেন।
অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামছ উদ্দিনের বিশেষ মূল্যায়ন:
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও স্কলার্সহোম টিলাগড় ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামছ উদ্দিন (আরণ্যক শামছ) নিজে দেবনীল সাহার লেখা ‘গুপ্তধনের খোঁজে’ বইটি পড়ে এর বিষয়বস্তু, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনার প্রশংসা করেন। তিনি অনুষ্ঠানে বইটি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনাও প্রদান করেন।
অধ্যক্ষ বলেন, একজন শিক্ষার্থীর হাতে লেখা একটি বই শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি অন্য শিক্ষার্থীদেরও লেখালেখি, সৃজনশীলতা ও পাঠচর্চায় উৎসাহিত করতে পারে। তিনি আরও জানান, দেবনীল সাহার ‘গুপ্তধনের খোঁজে’ বইটি নিয়ে তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় একটি পর্যালোচনা প্রকাশের উদ্যোগ নেবেন।
পাঠ থেকে প্রকাশ একটি সুন্দর শিক্ষামূলক প্রয়াস:
স্কলার্সহোম টিলাগড় ক্যাম্পাসের এই তিন দিনব্যাপী বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার আয়োজন ছিল না; এটি ছিল বই পড়া, বই নিয়ে ভাবা, নিজের উপলব্ধি প্রকাশ করা এবং অন্যের চিন্তাকে জানার একটি সম্মিলিত শিক্ষামূলক প্রয়াস।
বুক রিভিউ ও টক শোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেমন পাঠের আনন্দ পেয়েছে, তেমনি তাদের বক্তৃতা, উপস্থাপন, সমালোচনামূলক চিন্তা, আত্মবিশ্বাস ও যোগাযোগ দক্ষতা বিকাশেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্কলার্সহোম টিলাগড় ক্যাম্পাস বিশ্বাস করে, একটি ভালো বই একজন শিশুর চিন্তার জগৎকে বদলে দিতে পারে। তাই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং তাদের সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানো আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন সফল করতে সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ীদের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য স্কলার্সহোম টিলাগড় ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান প্রতিষ্ঠানের কোঅর্ডিনেটর সুমিত্রা মজুমদার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও দেশখ্যাত শিল্পী মোমিতা সিনহা।
বই হোক জ্ঞানের সঙ্গী, চিন্তার আলো এবং স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/আশিক-০৭
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.