আজ ২৫ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস | বিশ্বজুড়ে ওষুধ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান অংশীদার ফার্মাসিস্টদের অবদানকে সম্মান জানাতে আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (FIP) এর আহ্বানে প্রতি বছর এ দিনটি পালন করা হয় |
২০২৬ সালের বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো "Empowering pharmacists for healthier futures" সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের লক্ষ্যে ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন |
বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে সনদপ্রাপ্ত একজন ‘সি গ্রেড’ রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট হিসেবে দেশের তৃণমূল ও প্রান্তিক জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন নিয়োজিত থাকার পর আজকের এই দিনে হৃদয়ে যেমন গভীর পেশাগত আত্মমর্যাদা জেগে ওঠে, তেমনই মনে পড়ে আমাদের অর্জিত সাফল্য ও সামনের চ্যালেঞ্জগুলোর কথা |
ফার্মাসি পেশার বিবর্তন ও আধুনিক প্রেক্ষাপট / Evolution of the Pharmacy Profession & Modern Context
ফার্মাসিস্ট পেশার সূচনা ও বিবর্তন কেবল সাধারণ কিছু ওষুধ বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই | সময়ের সাথে সাথে এই পেশা ওষুধ গবেষণাগার থেকে শুরু করে রোগীদের শয্যাপাশ এবং মাঠপর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক ও মডেল ফার্মেসি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে | একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন, কিন্তু সেই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ারটি তৈরি, সঠিকভাবে বিতরণ ও সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করেন ফার্মাসিস্ট | ওষুধ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা এবং অন্যান্য ওষুধের সাথে বিক্রিয়া (Drug Interaction) বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত |
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় 'সি গ্রেড' রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা ও অবদান / Role of Class-C Registered Pharmacists in Primary Healthcare
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ে প্রথম সারির স্বাস্থ্যযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল সনদপ্রাপ্ত সি গ্রেড ফার্মাসিস্টরা | বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায়, যেখানে চিকিৎসকের সংকট রয়েছে বা পর্যাপ্ত হাসপাতাল সুবিধা নেই, সেখানে সাধারণ মানুষ যেকোনো শারীরিক সমস্যায় প্রথমেই একজন সি গ্রেড ফার্মাসিস্টের দ্বারে দ্বারে আসেন |
দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত থেকে আমরা যে ভূমিকা রেখে আসছি :
প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ : সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া বা কেটে-ছড়ে যাওয়ার মতো প্রাথমিক স্বাস্থ্য সমস্যায় দ্রুত ও সঠিক প্রাক চিকিৎসা সুবিধা প্রদান |
সঠিক ওষুধ বিতরণ ও কাউন্সেলিং : ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রোগীকে সঠিক মাত্রায় (Dose) ওষুধ বুঝিয়ে দেওয়া, খাওয়ার নিয়ম এবং ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া |
রেফারেল সেবা : রোগীর অবস্থা জটিল বা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে কালবিলম্ব না করে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার দ্রুত পরামর্শ দেওয়া |
স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি : মা ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো দূরারোগ্য ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে সচেতন করা |
বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের সাফল্য ও ফার্মাসিস্টদের অবদান / Pharma Success in Bangladesh & The Role of Pharmacists
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের ইতিহাস এক অভাবনীয় সফলতার গল্প | আশির দশকে যেখানে আমাদের দেশের ওষুধের সিংহভাগই আমদানি করতে হতো, সেখানে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির পর চিত্রটি পুরোপুরি বদলে যায় | আজ বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বললেই চলে | বর্তমানে দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে উন্নতমানের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে | এই গৌরবোজ্জ্বল পথচলায় এ গ্রেড, বি গ্রেড ও সি গ্রেড সকল পর্যায়ের ফার্মাসিস্টদের যৌথ প্রচেষ্টাই এই 'মেড ইন বাংলাদেশ' ট্যাগটিকে বিশ্ববাজারে সুনামের সাথে দাঁড় করিয়েছে |
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রোধে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা / Role of Pharmacists in Combating Antimicrobial Resistance
বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া | রোগীরা প্রায়শই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া বা পুরো ডোজ সম্পন্ন না করেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দেন | এই ভয়াবহ নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন একজন সি গ্রেড কমিউনিটি ফার্মাসিস্ট | দোকান পর্যায় থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করা এবং রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স শেষ করার গুরুত্ব বুঝিয়ে সচেতন করাই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব |
ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্টদের পদ সৃষ্টি ও সি গ্রেড ফার্মাসিস্টদের মূল্যায়ন / Professional Recognition & Strengthening Healthcare
দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে হলে যেমন হাসপাতালগুলোতে গ্র্যাজুয়েট 'ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট' পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, তেমনই তৃণমূল পর্যায়ে দিনরাত সেবা দেওয়া সি গ্রেড ফার্মাসিস্টদের সামাজিক ও পেশাগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি | ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে প্রশিক্ষণ ও সনদপ্রাপ্ত সি গ্রেড ফার্মাসিস্টরাই মূলত দেশে মডেল ফার্মেসি ও মডেল মেডিসিন শপের মাধ্যমে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখছেন | প্রশিক্ষণ জোরদার ও উপযুক্ত পেশাগত স্বীকৃতি প্রদান করলে তাঁরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারবেন |
আগামীর সম্ভাবনা ও আমাদের অঙ্গীকার / Future Prospects & Our Commitment
এবছরের প্রতিপাদ্য 'ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন' মূলত নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দেশের প্রতিটি স্তরের ফার্মাসিস্টদের যথাযথ স্বীকৃতি ও স্বাস্থ্যসেবায় তাঁদের মেধার পূর্ণ ব্যবহারের আহ্বান জানায় | Medicines expertise বা ওষুধ সংক্রান্ত জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগে একটি সুস্থ জাতি গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য |
ওষুধের প্রতিটি বড়ি ও ফাইলের পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন ফার্মাসিস্টের মেধা, দক্ষতা ও সততা | ফার্মাসিস্টরা থাকেন প্রচারের আলোর অন্তরালে, কিন্তু তাঁদের দেওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা ও সঠিক ওষুধই বাঁচিয়ে তোলে লাখো প্রাণ | দেশের কোটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত সি গ্রেড ফার্মাসিস্টদের সঠিক মূল্যায়ন ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দিলে একটি 'সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ' গড়া আরও সহজ হবে |
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে দেশ ও বিদেশের সকল সহকর্মী, এ গ্রেড, বি গ্রেড ও সি গ্রেড ফার্মাসিস্ট, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন | আসুন, সঠিক ওষুধ ও নিরাপদ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকারে আমরা সবাই এক হয়ে কাজ করি |
লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, এমকম (হিসাববিজ্ঞান), এম পিএইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য), বিফার্মা, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.