প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:৪৯ (বৃহস্পতিবার)
শিক্ষার্থীদের বি ক্ষো ভে উত্তাল ফ্রান্স, আ*ট*ক ৪৪০

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। স্কুলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষক সংকট ও দীর্ঘ ক্লাস সূচির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও স্কুল অবরোধের মধ্যে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বেশিরভাগই শিশু বা কিশোর বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
 

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, ‘দেশজুড়ে ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আমাকে জানানো হয়েছে, তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’
 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০ স্কুলের মধ্যে ৪০০টি বিক্ষোভ বা বিক্ষোভজনিত বিশৃঙ্খলায় আক্রান্ত হয়েছে।

গত সপ্তাহে প্যারিসে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে ধীরে ধীরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার উত্তরাঞ্চলীয় শহর লিলে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা ময়লার ঝুড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল, পাথর ও বিভিন্ন বস্তু ছোড়ে। বিক্ষোভকারীরা বাসের অপেক্ষাকেন্দ্র ও বিজ্ঞাপনের বোর্ড ভাঙচুর করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।
 

নুনেজ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানে মুখ ঢেকে, হাতে বিভিন্ন বস্তু নিয়ে বিক্ষোভে হাজির হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করে তাদের ওপর হামলা চালানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।’ তিনি জানান, মঙ্গলবারের সংঘর্ষে পুলিশের ওপর সাতবার হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। দেশজুড়ে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৪৮ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

পশ্চিমাঞ্চলীয় বোর্দো, রেন, নঁত এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই শহরেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। উত্তর প্যারিসের লামার্তিন লাইসেতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ক্লাস সূচির প্রতিবাদে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। ঘুমের চেয়েও বেশি সময় ক্লাস।’
 

প্যারিসের উপকণ্ঠ সেইন-সাঁ-দনি এলাকায় লিসে পল-এলুয়ারের সামনে কয়েকশ শিক্ষার্থীর বিক্ষোভে যোগ দেন মেয়র বালি বাগায়োকো। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাতীয় সংগীত গেয়ে তিনি বিক্ষোভকে ‘সম্পূর্ণ বৈধ’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে নিম্নআয়ের এলাকাগুলো উচ্চআয়ের এলাকার তুলনায় কম সরকারি সম্পদ পায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, একপর্যায়ে সেখানে ভিড় জমলে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী ঢাল হাতে পুলিশ সদস্যরা লাঠি দিয়ে শিক্ষার্থীদের আঘাত করেন।
 

এর আগে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বিক্ষোভকে আরও সহিংস করে তোলাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ বলে মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে আতশবাজি, আগুন ও সহিংসতা; শিক্ষার্থী, কর্মী বা পুলিশকে বিপদের মধ্যে ফেলার কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়।’

তবে বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবুয়াঁর (এলএফআই) নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। সোমবার এক্সে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিকর নয়। তার অভিযোগ, লেকর্নু সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়নের নির্দেশ দিয়েছে এবং এতে ‘বর্ণবাদী ইঙ্গিত’ রয়েছে।

জবাবে লেকর্নু মেলঁশোঁর বক্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন উত্তেজনা সৃষ্টি’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব তরুণদের সুরক্ষা দেওয়া এবং শান্ত থাকার আহ্বান জানানো। রাজনৈতিক স্বার্থে তাদের ক্ষোভকে কাজে লাগানো ঠিক নয়। মেলঁশোঁর বর্ণবাদের অভিযোগকে তিনি ‘অপমানজনক’ বলেও মন্তব্য করেন।
 

সরকারের বাজেট পরিকল্পনার প্রতিবাদে একই সময়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ধর্মঘটে যায়। পরিকল্পনায় সরকারি ব্যয় ৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। মঙ্গলবার বিভিন্ন সরকারি খাতের কর্মীরা কাজে যোগ দেননি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশ ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন ইউনিয়ন সিন্দিকাল লিসেনের (ইউএসএল) সভাপতি রিয়াদ রানি এর সমান্তরাল কর্মসূচি হিসেবে ফ্রান্সের সব উচ্চবিদ্যালয় অবরোধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানান।
 

রানি বলেন, শিক্ষার্থীরা সামগ্রিক সম্পদের ঘাটতি, ৩২ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষক ও কর্মী সংকটের প্রতিবাদ করছে। উচ্চবিদ্যালয়ের বাইরে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে অনুপাতসম্মত শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠানো নির্দেশনাকে তিনি চরম কেলেঙ্কারি বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের কথা বলছি। সরকারের একমাত্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দমন। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীরা আরও ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক পরিবেশের দাবিতে আন্দোলন করছে, আর তাদের মোকাবিলায় পাঠানো হচ্ছে অপরাধ দমন ইউনিট ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ।’

কিছু শিক্ষক ও স্কুলকর্মী শিক্ষার্থীদের পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন বলেও জানান রানি।
 

প্রধান শিক্ষক ইউনিয়ন ফেডারেশন সিন্দিকাল ইউনিতেয়ারের (এফএসইউ) মহাসচিব ক্যারোলিন শেভে মঙ্গলবার মধ্য প্যারিসের একটি মিছিলে অংশ নেন। তিনি শিক্ষার্থীদের হতাশা বুঝতে পারছেন বলে জানান।

শেভে বলেন, ‘তারা আমাদের মতো একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাদের শ্রেণিকক্ষগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়। শিক্ষক সংকটের কারণে কখনও কখনও পর্যাপ্ত শিক্ষকও থাকে না। তারা আমাদের মতো একই বাস্তবতা দেখছে এবং তারা ক্ষুব্ধ।’




সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৪