২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজধানীসহ দেশজুড়ে জমি দখল, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতনসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে মানুষ। আর এর প্রভাব পড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝেও।
বাংলাদেশে ব্যবসা বা নতুন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগে নিরাপত্তা ও দখল-চাঁদাবাজিতে ব্যবসা ঝুঁকির মাঝে পড়বে কি-না এমন হিসাবও কষছেন তাঁরা।
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপি'র প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি-সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত হিসেবে ১ হাজার ৫৩০ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ২৭৮ জনকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৩০ জন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বর্তমান বা সাবেক নেতাকর্মী। মাঠপর্যায়ের তালিকাতে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম রয়েছে।
তালিকার বাইরে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এতে আরও বেশি উদ্বেগ বাড়ছে প্রবাসীদের মাঝে। এ অবস্থায় দেশে ফিরে ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কার কথা জানাচ্ছেন অনেকে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর ভারী যন্ত্র দিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। লুট হওয়া মালামালের দুই ট্রাকও উদ্ধার করা হয়।
মামলায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি নেতা হানিফ, পাপেলসহ যুবদল ও ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের নাম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে জমি দখলের এই ঘটনায় মদদ দিয়েছেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি। তবে তারা দু’জনই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তদন্তে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম উঠে আসার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
ঘটনার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকলেও হামলা ঠেকাতে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। এর একদিন পরই রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আলোচনায় আসে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও।
সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করে বলেন, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর বিএনপি কর্মীরা তাঁর স্টুডিওতে হামলা হয়েছে। হামলায় স্টুডিওর ক্যামেরা, সিসিটিভি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত ও লুট হওয়ার কথা জানান তিনি।
তবে পুলিশ জানিয়েছে জমি-সংক্রান্ত বিরোধে এ ঘটনা ঘটেছে। ডিএমপি জানিয়েছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজ ও অন্য একটি পক্ষের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধের জেরেই হামলা হয়েছে। পরে এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
রাজধানীসহ দেশজুড়ে এমন সব ঘটনা দিনদিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে। বিশেষত যাঁরা দেশে আবাসন, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন বা অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের অনেকেই এখন বিকল্প চিন্তা করছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে প্রশ্ন তুলে বলছেন, বিদেশে বসে দেশে বিনিয়োগ করে লাভের সম্ভাবনার পাশাপাশি সম্পত্তি রক্ষা নিয়েও যদি চিন্তা করতে হয় তাহলে এই ঝুঁকি নেয়ার দরকারই বা কী? প্রবাসী কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে এমন উদ্বেগের কথা জানা গেছে।
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী উদ্যোক্তা আরমান হোসেন বলেন, আমরা যারা প্রবাসী, জন্মস্থানের প্রতি তাদের সবসময় একটা টান কাজ করে। সেই টান থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করার আগ্রহ আছে। কিন্তু দেশে যা চলছে, বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও দখলের মহোৎসব, এসব খবর শুনলে বিনিয়োগ না করাই ভালো মনে হয়।
তিনি আরও বলেন, বন্ধুরা মিলে সামনের বছর দেশে বেশ বড় অংকের টাকা বিনিয়োগের চিন্তা করছিলাম। দেশের পরিস্থিতি দেখে এখন আবার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছি। ভাবছি কয়েক মাসে যদি দেশের পরিস্থিতি ভালো না হয় তাহলে অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করবো।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হাবিবুর রশীদ বলেন, দেশে আবাসন খাতে বিনিয়োগ করার ইচ্ছা ছিলো। এমনতি দেশে বিনিয়োগের প্রক্রিয়াটা অনেক জটিল। তারনওপর এখন বিনিয়োগ করে যদি চাঁদা দিতে হয়ম, আবার চাঁদা না দিলে ভাংচুর, দখল হয়ে যায় তাহলে তো টাকা খরচ করে এই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আরেক বাংলাদেশি বুরহান উদ্দিন বলেন, অনেক লন্ডনী দেশে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান, অনেকে বিনিয়োগও করেন। দেশের প্রতি টান থেকে আমরাও পারিবারিকভাবে সিলেটে বড় একটি খামার তৈরিতে বিনিয়োগের কথা ভাবছিলাম। আগে শুনেছিলাম নির্বাচন হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নির্বাচনের ছয়-সাত মাস পরও কিছুই ঠিক হয়নি। উল্টো, চাঁদাবাজি, দখলবাজি বাড়ছে।
তিনি বলেন, রাড্ডা ক্লিনিকের জমি দখল, চাঁদা না দেয়ায় সালমানের স্টুডিও ভাংচুর এসব দেখে কেন ঝুঁকি নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করতে যাবো? সবাইকে বলে দিয়েছি, দেশে বিনিয়োগ করলে কেউ চাপ দিবে না, আমার টাকা ঝুঁকিতে পড়বে না এমন নিশ্চয়তা পেলে তবেই কেবল বিনিয়োগ করবো।
সিলেটভিউ/কেআরএস/এসডি-০১
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.