শিক্ষক দিবস হচ্ছে শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটা বিশেষ দিন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে এই দিবসটি পালন করা হয়। দেশসমূহ জাতীয়ভাবে যখন এই দিবস উদযাপন করে তখন তাকে জাতীয় শিক্ষক দিবস বলা হয়, আবার জাতিসংঘের ইউনেস্কো ও আইএলও কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক যে-দিন তা উদযাপন করা হয় তাকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস বলা হয়।
৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের সম্মানার্থে পালিত একটা বিশেষ দিন। শিক্ষকদের নিজ কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি বা সম্মান্ন দেয়া হয় এইদিন। ১৯৯৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর প্রায় শতাধিক দেশ এবং এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (ইআই) ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন এই দিবসটি পালনে বিশেষ
ভূমিকা রাখছে।
২০০৩ সাল হতে বাংলাদেশে ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের রেওয়াজ চালু হয় কিন্তু ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে উদযাপন করা শুরু হয়। ভারতে প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, দার্শনিক, অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণন ১৮৮৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে দেশে বিদেশে থাকা তাঁর শিক্ষার্থীরা যখন উনার জন্মদিন উদযাপন করতে চাইলেন তখন তিনি ঐ দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁর ইচ্ছেতে ১৯৬২ সালের ৫ অক্টোবর উনার ৭৫ তম জন্মদিন থেকেই ভারতে শিক্ষক দিবস পালনের রেওয়াজ চালু হয়।
বিশ্বব্যাপী শিক্ষকদের মানসম্মত শিক্ষাদান, সমাজ বিনির্মাণে তাঁদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ( আইএলও) যৌথ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত ‘শিক্ষকদের মর্যাদা সম্পর্কিত সুপারিশ’ স্মরণে এই দিবসটি নির্বাচন করা হয়।
এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে এবং সেটির প্রচার-প্রচারণা দ্বারা গণসচেতনতা তৈরি করে মানুষের মধ্যে, সমাজব্যবস্থায় শিক্ষকদের অবদান, কর্মপ্রয়াস, স্মরণ করে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা নেয়। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) এবং এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (ইআই) বিশ্ববাসীকে জানাতে চায় যে, শিক্ষকরা শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও সমাজব্যবস্থার মঙ্গলার্থে, বিকাশে, উৎকর্ষতা সাধনে কতটুকু ভূমিকা পালন করেন।
সমাজ তথা রাষ্ট্রব্যবস্থা এগিয়ে চলার পথে যে মানবসম্পদ মূখ্য ভূমিকা পালন করে সেই জনসম্পদ তৈরি, সুনাগরিক সৃষ্টি, জ্ঞানপিপাসু প্রজন্ম গড়ে তুলা, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগানো, নীতি ও নৈতিকতার ভিত্তি বা বীজ বপন করার মহৎকর্মটি করে থাকেন একজন আদর্শ, গুণী শিক্ষক। যে সমাজে গুণী শিক্ষকের সংখ্যা যত বেশি সে সমাজে সৎ, নীতিবাদী, কর্মনিষ্ঠ, সুনাগরিক তত বেশি। শিক্ষিত মানুষ হাত-পা গুটিয়ে থাকেননা। তাঁরা আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন হয়ে থাকেন বিধায় অন্যের মুখাপেক্ষী না থেকে নিজের সামর্থ্যের সবটুকুই নিজ তথা সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন, অগ্রগতি, ইতিবাচক পরিবর্তনের আকাঙক্ষায় নিয়োজিত করেন। সমাজ তথা রাষ্ট্রব্যবস্থা শিক্ষকদের মহৎকর্মের স্বীকৃতি প্রদান করে একজন গুণী শিক্ষকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও সম্মান প্রদর্শন করে এ দিনটিতে।
বাংলাদেশে শিক্ষকসম্প্রদায় যে সম্মান, সম্মানী, মর্যাদা, নিরাপত্তা পাওয়ার কথা ছিল তা কিন্তু পান না। এখানে শিক্ষা ও শিক্ষক সমাজ যুগে যুগে অসচ্ছল, অবহেলায় জীবন যাপন করেছেন – করছেন। এখনো শিক্ষা নিয়ে প্রতিনিয়ত যাচাই-বাছাই চলছে। গবেষণা হবে। তাইবলে এত্তো ঘনঘন শিক্ষার পদ্ধতি, মূল্যায়নের ধরনের পরিবর্তন মোটেও সুখকর বিষয় নয়। ছাত্রছাত্রী গিনিপিগ নয়, নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়টি গুরুত্বদিয়ে অনুধাবন করতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় ৯০ শতাংশ দায়িত্ব বেসরকারি শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পালন করে থাকেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হওয়ার পরও এখনো বেসরকারি শিক্ষকসমাজ তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। সময়ে সময়ে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ রাষ্ট্র থেকে শতভাগ বেতন আদায় করে নিয়েছেন সত্যি কিন্তু অন্যান্য ভাতাদির ন্যায্য হিস্যা এখনো অধরা রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষায় প্রকট বৈষম্য বিদ্যমান। বহুবিধ প্রকৃতি ও ধারার শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এখন সময়ের দাবি শিক্ষায় সকল ব্যবধান ঘুছিয়ে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ। এতে শিক্ষা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক উপকৃত হবে এবং সম্মিলিতভাবে জাতি লাভবান হবে। বাংলাদেশের শিক্ষা ও বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য যেসকল শিক্ষক কর্মচারী সংগঠন যেমন – বাংলাদেশ স্কুল শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, শিক্ষক ফোরাম, শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন সেই সকল সংগঠনের শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে – The UNESCO World Teachers' Day theme for 2026 is “Standing with teachers: 60 years of protecting the profession, advancing its status and shaping our futures.”
“শিক্ষকদের পাশে : পেশা সুরক্ষা, এর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর।”
উপরোক্ত প্রতিপাদ্য বিষয় পর্যালোচনা করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষক সমাজ এখনো অনিরাপদ। তাঁদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে এবং এই দায়িত্ব সরকার তথা রাষ্ট্রের। মর্যাদার প্রশ্নে শিক্ষকদের যা প্রাপ্য সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা তা নিশ্চিত করছে না। বিধায় সভ্য, সুন্দর জীবনযাপন করা, শিক্ষার্থীদের যথোপযুক্ত জ্ঞান দান শিক্ষকদের পক্ষে অনেকক্ষেত্রে অসম্ভব, তাইতো মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত যুবক যুবতী এ পেশায় আসতে এখনো অনাগ্রহী। শিক্ষকতা পেশায় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, সামাজিক মর্যাদা দ্রুত নিশ্চিত না করতে পারলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সহসাই কোনো অগ্রগতি অসম্ভব। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ দাঁড়িয়ে বৈষম্যহীন শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ করার জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
লেখক: মো. আব্দুল জলিল, অধ্যক্ষ, মাহমুদ উস সামাদ ফারজানা চৌধুরী গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজ, ফেঞ্চুগঞ্জ। সভাপতি, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি, সিলেট মহানগর।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.