চোখ মানুষের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ | পৃথিবীকে দেখা, পড়াশোনা করা, কাজ করা, চলাফেরা করা, প্রিয়জনকে চিনতে পারা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য কাজের সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি সরাসরি জড়িত | অথচ অনেক সময় আমরা চোখের যত্নকে গুরুত্ব দিই না | চোখে সমস্যা দেখা দেওয়ার পরও অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে নিজে নিজে ওষুধ বা চোখের ড্রপ ব্যবহার করেন, আবার অনেকে দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে কমে গেলেও বিষয়টি দীর্ঘদিন অবহেলা করেন | এই অবহেলা কখনো কখনো গুরুতর দৃষ্টিজনিত সমস্যার কারণ হতে পারে |
প্রতি বছর বিশ্ব দৃষ্টি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় চোখের সুস্থতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয় এটি পরিবার, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ | তাই চোখের সমস্যা প্রতিরোধ, সময়মতো শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি |
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৬ এর এই দিনে আমার নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে চোখের যত্ন ও প্রাথমিক চক্ষুস্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছু কথা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই |
আমার চক্ষুস্বাস্থ্য সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা |
আমি এসএমসির ভিশন স্প্রিং এর প্রাথমিক চক্ষু চিকিৎসায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত | পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি চক্ষু বিভাগে জ্যেষ্ঠ অঞ্চল বিক্রয় ব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে |
পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের চক্ষু বিভাগে কাজ করার সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বনামধন্য চক্ষু চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে | একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন চক্ষু সেবা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি | এ অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু চক্ষুস্বাস্থ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ দেয়নি বরং রোগীকে প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতন করা, সমস্যার গুরুত্ব বোঝানো এবং প্রয়োজনে যথাযথ চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর গুরুত্বও উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে |
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক চক্ষু সেবা চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিকল্প নয় | প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতনতা, সাধারণ স্বাস্থ্যপরামর্শ ও ঝুঁকির লক্ষণ চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও জটিল বা গুরুতর চোখের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই নিবন্ধিত চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত |
কেন নিয়মিত চোখ পরীক্ষা জরুরি ?
অনেক চোখের সমস্যা শুরুতে তেমন কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি করে না | ফলে মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তার দৃষ্টিশক্তির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে | বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ |
কোনো ব্যক্তি যদি দূরের লেখা স্পষ্ট দেখতে না পান, বই পড়ার সময় চোখে চাপ লাগে, মাথাব্যথা হয়, বারবার চোখ কুঁচকে দেখতে হয় অথবা মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহারের পর দৃষ্টি ঝাপসা লাগে তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে চোখ পরীক্ষা করা উচিত |
শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | কোনো শিশু বই বা খাতা খুব কাছে নিয়ে পড়ে, টেলিভিশনের কাছে গিয়ে বসে, চোখ কুঁচকে দেখে, এক চোখ বন্ধ করে দেখে অথবা স্কুলের বোর্ডের লেখা দেখতে অসুবিধা বোধ করে তাহলে তার দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা দরকার |
ডিজিটাল স্ক্রিন ও চোখ
বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাব ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে | পড়াশোনা, অফিসের কাজ, ব্যবসা বাণিজ্য এবং যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই স্ক্রিনের ব্যবহার বেড়েছে |
দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া, ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা বা মাথাব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে | তাই স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মিত বিরতি নেওয়া উচিত |
এ ক্ষেত্রে প্রচলিত ২০-২০-২০ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে প্রায় ২০ মিনিট পরপর কিছু সময়ের জন্য স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকানো | পাশাপাশি পর্যাপ্ত আলোতে পড়াশোনা করা, স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা এবং দীর্ঘ সময় একটানা মোবাইল ব্যবহার না করার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো |
শিশুদের চোখের যত্নে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
শিশুর চোখের সমস্যা অনেক সময় শিশুর নিজের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না | সে হয়তো মনে করতে পারে যে সবাই তার মতোই দেখছে | তাই অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন থাকা জরুরি |
শিশু যদি ক্লাসের বোর্ড দেখতে না পারে, পড়ার সময় খুব কাছে ঝুঁকে থাকে, বারবার চোখ ঘষে, পড়ার সময় মাথাব্যথার কথা বলে অথবা পড়াশোনায় হঠাৎ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তাহলে শুধু তাকে মনোযোগী হতে বলা যথেষ্ট নয় তার চোখের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করানো প্রয়োজন হতে পারে |
শিশুর দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব |
বয়স্কদের চোখের যত্ন
বয়স বাড়ার সঙ্গে চোখের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। | কাছে দেখতে অসুবিধা, ছানি, গ্লুকোমা, চোখের রেটিনার বিভিন্ন সমস্যা এবং অন্যান্য বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে |
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি যদি ধীরে ধীরে দেখতে কমে যাওয়া, আলোতে সমস্যা, চোখের সামনে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিক্ষেত্রে পরিবর্তনের কথা বলেন, তাহলে তাকে অবহেলা না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত |
ডায়াবেটিস ও চোখ
ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস চোখের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে | তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ |
অনেক সময় চোখের সমস্যা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে রোগী তেমন কোনো উপসর্গ অনুভব নাও করতে পারেন | এ কারণে শুধু ভালো দেখতে পাচ্ছেন বলে চোখ সম্পূর্ণ সুস্থ এমন ধারণা করা ঠিক নয় |
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চোখের সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ |
চোখে ব্যথা বা লাল হলে নিজে নিজে ড্রপ নয়
আমাদের সমাজে চোখ লাল হলে বা চোখে অস্বস্তি হলে নিজের পরিচিত কারও পরামর্শে অথবা আগের প্রেসক্রিপশন দেখে চোখের ড্রপ ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে। এটি সব সময় নিরাপদ নয় |
চোখ লাল হওয়ার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে | অ্যালার্জি, সংক্রমণ, শুষ্ক চোখ কিংবা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার কারণেও চোখ লাল হতে পারে তাই বিশেষ করে স্টেরয়েডযুক্ত চোখের ড্রপ নিজের ইচ্ছায় ব্যবহার করা উচিত নয় |
চোখের যেকোনো ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্যপেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ |
কখন দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে ?
কিছু লক্ষণকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয় | যেমন
হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
চোখে তীব্র ব্যথা
চোখে আঘাত লাগা
চোখ লাল হওয়ার সঙ্গে দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া
চোখের সামনে হঠাৎ অনেক কালো দাগ বা ভাসমান ছায়া দেখা
আলো ঝলকানি দেখা
চোখে রাসায়নিক পদার্থ পড়া
একটি চোখ দিয়ে হঠাৎ কম দেখা
দৃষ্টির কোনো অংশ অন্ধকার বা পর্দার মতো মনে হওয়া
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেরি না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত |
পুষ্টি ও চোখের স্বাস্থ্য
চোখের সুস্থতার জন্য সুষম খাদ্যও গুরুত্বপূর্ণ |শাকসবজি, রঙিন সবজি ও ফলমূল, ডিম, মাছ, ডাল, বাদামসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত | পর্যাপ্ত পানি পান এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ |
তবে কোনো নির্দিষ্ট ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট চোখের সব রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করে এমন ধারণা ঠিক নয় |
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টি বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত |
ধূমপান থেকে বিরত থাকুন
ধূমপান শুধু ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর নয় এটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং চোখের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত | তাই নিজের চোখ, ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র এবং পরিবারের সুস্থতার জন্য ধূমপান থেকে বিরত থাকা উচিত |
চোখের সুরক্ষায় ছোট ছোট অভ্যাস
চোখের যত্নের জন্য খুব জটিল কিছু করার প্রয়োজন নেই | দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুললেই অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব |
পরিষ্কার হাতে চোখ স্পর্শ করা, অন্যের তোয়ালে বা ব্যক্তিগত চোখের প্রসাধনী ব্যবহার না করা, ধুলোবালি বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষাচশমা ব্যবহার করা এবং চোখের কোনো সমস্যা হলে দ্রুত পরামর্শ নেওয়া উচিত |
শিশুদের খেলাধুলার সময় চোখে আঘাত লাগতে পারে এ বিষয়েও অভিভাবকদের সতর্ক থাকা দরকার |
বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের অঙ্গীকার
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস শুধু একটি দিবস পালন করার বিষয় নয় | এটি আমাদের প্রত্যেককে নিজের এবং পরিবারের চোখের স্বাস্থ্যের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার একটি সুযোগ |
আমরা যদি নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করি, শিশুদের দৃষ্টিশক্তির প্রতি নজর রাখি, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখি, ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারে সচেতন হই, নিজের ইচ্ছায় চোখের ওষুধ ব্যবহার না করি এবং গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাই তাহলে দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষায় আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি
আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, চোখের রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা শনাক্ত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | একজন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী হিসেবে আমার ভূমিকা হলো সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যার গুরুত্ব বোঝানো এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া |
কারণ চোখের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সব সময় মনে রাখা দরকার দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর আফসোস করার চেয়ে সময় থাকতে সচেতন হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ |
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৬
চোখের যত্ন নিন, নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করুন |
দৃষ্টিশক্তির সমস্যা অবহেলা নয় সময়মতো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন |
সুস্থ চোখ, পরিষ্কার দৃষ্টি—সুন্দর জীবনের জন্য অপরিহার্য |
লেখক: মনজুরুল মা আবুদ, এসএমসি'র ভিশন স্প্রিং প্রাথমিক চক্ষু চিকিৎসায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি এর চক্ষু বিভাগে সাবেক জ্যেষ্ঠ অঞ্চল বিক্রয় ব্যবস্থাপক।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.