কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়ার। গ্রেপ্তারকৃত আসামির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং তার দেখানো স্থান থেকে ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন কুমিল্লার এই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে তার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পঙ্কজ বড়ুয়া এসব তথ্য জানান। তবে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিতভাবে বলা যাবে বলে জানায় পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, আসামি ভিকটিমকে হত্যার পর তার ব্যবহৃত আইফোনটি নিয়ে যায়। পরে কুমিল্লার বাকরাবাদ এলাকায় একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে চলে যায়। পরদিন চট্টগ্রাম থেকে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আসামির দেখানো মতে বাকরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি তাকে কীভাবে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে বর্ণনা দিয়েছে এবং ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলমান।
ঘটনার সময় ভিকটিম কোথায় ছিলেন?
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে ভিকটিম একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। ওই সময় থেকে সিএনজি চালক তাকে নিয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। মাঝের সময়টুকু ভিকটিম ও সিএনজি চালক একসঙ্গে ছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।
যদিও ভিকটিম এর আগে কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন এবং কীভাবে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেছেন- এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
৪ তারিখ বাড়ি থেকে বের হওয়ার বিষয়ে তদন্ত চলছে
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ভিকটিমের বাবা পুলিশকে জানিয়েছেন- তার মেয়ে গত ৪ তারিখ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। তবে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিনি কোথায় গেছেন, কীভাবে গেছেন কিংবা কারও সঙ্গে গিয়েছিলেন কি-না, সে বিষয়ে পুলিশকে আগে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি এবং কোনো অভিযোগও জানানো হয়নি। ভিকটিমের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পেছনে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি-না, তার কোনো ছেলে বন্ধু বা বান্ধবী ছিলেন কি-না এবং কারও সহযোগিতা ছিল কি-না? এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘মামলাটা তদন্তাধীন। আমরা ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছি। পুরো বিষয়টি তদন্তে সামনে নিয়ে আসা হবে।’
ধর্ষণের বিষয়ে ফরেনসিক প্রতিবেদন আসার অপেক্ষা
ধর্ষণের ঘটনা হত্যা করার আগে নাকি পরে ঘটেছে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, আসামি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। তবে ভিকটিম ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কি-না, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সব ধরনের বস্তুগত সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ফরেনসিক পরীক্ষা রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত রিপোর্ট আসার পরে এটা কনক্লুসিভলি বলা যায়।’
অর্থাৎ ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই ধর্ষণের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত জানানো সম্ভব হবে।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভিডিও ফুটেজ পাওয়ার কথা জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আনুমানিক ৫০০ গজ বা আধা কিলোমিটারের মধ্যে একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। ওই ফুটেজে ভিকটিমকে সিএনজিতে শান্ত অবস্থায় এক পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। তবে সিএনজির ভেতরে আরও কেউ থাকতে পারেন বলে ফুটেজ দেখে মনে হয়েছে।
ভিকটিম চিৎকার করেছিলেন কি-না কিংবা ঘটনার আগে কী হয়েছিল- এসব বিষয়ে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ফুটেজটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে এখন পর্যন্ত ওই আসামির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
সাংবাদিকেরা দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে পৌনে একটা পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশের টহল ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, তিনি জেলা পুলিশের অধীনে চাকরি করেন। তাই হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে এ মুহূর্তে কোনো উত্তর দিতে পারবেন না।
ভিকটিমের লাইভ লোকেশন শেয়ার করার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ভিকটিম রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তার বাবার সঙ্গে লাইভ লোকেশন শেয়ার করেন। তবে তার বাবা তখনই লোকেশনটি দেখেননি। পরে খোঁজাখুঁজি করতে করতে ওই এলাকায় যান।
তিনি জানান, এর আগেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিল। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে লাশ পাওয়ার খবর পেয়ে ভিকটিমের বাবা সেখানে আসেন। পুলিশ তাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গেলে তিনি লাশ শনাক্ত করেন।
কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
উদ্ধার করা আইফোনটি ভিকটিমকে তার বাবা কিনে দিয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ভিকটিমকে হত্যার পর তার কাছ থেকে আইফোনটি নিয়ে যান আসামি। পরে বাকরাবাদ এলাকার একটি পুকুরপাড়ে ফোনটি লুকিয়ে রাখেন।
আসামিকে গ্রেপ্তারের পর তার দেখানো মতে ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আইফোনটি ভিকটিমের পরিবারের কেউ কিনে দিয়েছিলেন কি না, তা তার বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা হবে।
ফোনটি কখন বন্ধ করা হয়েছিল এবং কে বন্ধ করেছিলেন? এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, সিএনজি চালকই মোবাইলটি বন্ধ করেন। এরপর বাকরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ে ফোনটি লুকিয়ে রেখে তিনি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরে চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লায় আনা হয় এবং তার দেখানো মতে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার অন্যান্য দিকও সামনে আসবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৯
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.