প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:২০ (রবিবার)
অভিজ্ঞতার কথা হোক শোনা, বাস্তব পরিবর্তন আসুক সবার জীবনে

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬

মানুষের কথা শোনা থেকেই পরিবর্তনের শুরু
Change Begins by Listening to People

মানুষের জীবনে এমন কিছু কষ্ট থাকে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না | কেউ হাসিমুখে কাজ করেন, পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যান কিংবা ব্যবসা পরিচালনা করেন অথচ তাঁর ভেতরে চলতে পারে গভীর দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব, হতাশা অথবা মানসিক চাপ | অনেক সময় সেই কষ্টের কথা কাউকে বলার মতো নিরাপদ পরিবেশও তিনি পান না।

আমরা সাধারণত মানুষের শারীরিক অসুস্থতা সহজে বুঝতে চেষ্টা করি | জ্বর হলে তাপমাত্রা মাপি, ব্যথা হলে কারণ খুঁজি, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিই | কিন্তু কেউ যখন বলেন, ‘আমার মন ভালো নেই’, তখন তাঁকে অনেক সময় বলা হয়, ‘এত চিন্তা করো না’  সব ঠিক হয়ে যাবে’ কিংবা ‘মন শক্ত করো’ | কথাগুলো সদিচ্ছা থেকে বলা হলেও সব সময় তা সমস্যার সমাধান করে না।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় থাকা মানুষের প্রয়োজন শুধু উপদেশ নয়  প্রয়োজন মনোযোগ দিয়ে শোনা, সম্মান, সহমর্মিতা এবং যথাযথ সহায়তা।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ প্রতিপাদ্য “Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change” “অভিজ্ঞতার কথা হোক শোনা, বাস্তব পরিবর্তন আসুক সবার জীবনে |  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছরের কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া এবং তাঁদের মতামতকে সেবা ও নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
 তথ্যসূত্র: WHO, World Mental Health Day 2026।

মানসিক স্বাস্থ্য : শরীরের মতো মনেরও যত্ন প্রয়োজন
Mental Health : The Mind Needs Care, Just Like the Body
মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ | নিজের অনুভূতি বুঝতে পারা, দৈনন্দিন চাপ সামলানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, অন্যের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জীবনের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করা এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

জীবনে দুঃখ, উদ্বেগ, হতাশা কিংবা মানসিক চাপ আসতেই পারে | আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, প্রিয়জনকে হারানো অথবা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা মানুষের মনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এসব অনুভূতি থাকা মানেই মানসিক রোগ হয়েছে, এমন নয় | তবে কষ্ট দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, তীব্রতা বাড়লে কিংবা ঘুম, খাওয়া, পড়াশোনা, কাজ ও সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেললে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কোনো লজ্জা বা চরিত্রের দুর্বলতা নয় | যথাযথ মূল্যায়ন, চিকিৎসা, সামাজিক সহায়তা এবং ব্যক্তির নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে অনেক মানুষ উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারেন।

মানুষের অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ ?
Why Do Lived Experiences Matter ?

মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বই পড়ে, প্রশিক্ষণ নিয়ে, গবেষণা করে এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন করে জ্ঞান বাড়ানো যায় | কিন্তু যিনি নিজে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন, চিকিৎসা নিতে গিয়ে বাধার মুখোমুখি হয়েছেন কিংবা সমাজের অবহেলা অনুভব করেছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা একটি বিশেষ ধরনের শিক্ষা দেয়।

কেউ হয়তো চিকিৎসা নিতে গিয়ে অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছেন | কেউ পরিবারকে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারেননি | কেউ আবার সমাজের নেতিবাচক মন্তব্যের ভয়ে সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন | এসব অভিজ্ঞতা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেবল সেবা চালু করলেই যথেষ্ট নয়  সেবাটি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, সহজলভ্য, সম্মানজনক এবং কার্যকর কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তা হলো, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষকে শুধু তাঁদের গল্প বলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে থেমে গেলে চলবে না | তাঁদের মতামত পরিকল্পনা, সেবা প্রদান ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে হবে।

অর্থাৎ, মানুষের কথা শোনা হবে, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা হবে এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাস্তব পরিবর্তন আনা হবে।

প্রযুক্তির যুগে মানসিক চাপ
Mental Stress in the Digital Age
বর্তমানে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে সহজ করেছে | অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ, ব্যবসা পরিচালনা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য সংগ্রহের সুযোগ বেড়েছে | কিন্তু প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিছু মানুষের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য, সম্পদ কিংবা আনন্দের মুহূর্ত দেখে কেউ নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করতে পারেন | অনলাইন হয়রানি, অপমানজনক মন্তব্য, ভুয়া সংবাদ এবং নেতিবাচক তথ্যও মানসিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে | রাত জেগে ফোন ব্যবহার করলে ঘুমের স্বাভাবিক রুটিন ব্যাহত হতে পারে।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই মানসিক সমস্যা হয়, এমন সিদ্ধান্ত ঠিক নয় | ব্যবহারের ধরন, সময়, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এবং অনলাইনে কী ধরনের বিষয় দেখা হচ্ছে সবকিছু বিবেচনা করা জরুরি।

মানসিক সুস্থতার জন্য অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাঁটাচলা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং নিজের অনুভূতি বিশ্বস্ত কারও কাছে প্রকাশ করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে |
কোনো ব্যক্তি প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে সমস্যায় পড়ছেন কি না, তা তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনে বুঝতে চেষ্টা করতে হবে | সবার জন্য একই নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাঁর পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়তার পথ খুঁজতে হবে। 

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা
The Role of Family and Society
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | পরিবারের কোনো সদস্য দীর্ঘদিন মন খারাপ করে থাকলে, আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারালে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিলে কিংবা আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে তাঁকে দোষারোপ না করে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে।

‘তুমি দুর্বল’, ‘তোমার কোনো সমস্যা নেই’ অথবা ‘মানুষ কী বলবে’ এ ধরনের মন্তব্য একজন কষ্টে থাকা মানুষকে আরও একা করে দিতে পারে |
তার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘তোমার কষ্টের কথা আমি শুনতে চাই’, ‘তুমি চাইলে আমরা একসঙ্গে সাহায্য নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি’।
শিশু কিশোরদের ক্ষেত্রেও একইভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন | পড়াশোনার ফলাফল, পারিবারিক প্রত্যাশা, অনলাইন হয়রানি এবং বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের মনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে | তাদের কথা শোনা, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সংগঠনেও এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললে কাউকে অপমান বা বৈষম্যের শিকার হতে হবে না।

প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা একজন মানুষ কখনো কখনো শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক চাপের কথাও বলতে পারেন | তাঁর কথা সম্মানের সঙ্গে শোনা, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাধারণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া, বিপদের লক্ষণ চিনতে সচেতন করা এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর কাছে যেতে উৎসাহিত করা এসব জনস্বাস্থ্য সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কখন বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া জরুরি ?
When Is Professional Help Necessary ?
দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত উদ্বেগ, ঘুম বা ক্ষুধার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, মনোযোগের সমস্যা কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে অসুবিধা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত |
একটি লক্ষণ দেখেই মানসিক রোগ নির্ণয় করা যায় না | উপসর্গের ধরন, স্থায়িত্ব, তীব্রতা এবং ব্যক্তির সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।


সহায়তা চাওয়া দুর্বলতা নয় ; এটি নিজের সুস্থতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

শুধু শোনা নয়, বাস্তব পরিবর্তন চাই
Not Just Listening : We Need Real Change

মানুষের কথা শোনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই কথার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয় | কোনো ব্যক্তি সেবা নিতে গিয়ে অপমানিত হলে, অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পেলে কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভয় পেলে তাঁর সমস্যার সমাধানে বাস্তব উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবায় গোপনীয়তা রক্ষা, রোগীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, সহজ ভাষায় তথ্য প্রদান, যথাযথ রেফারেল ব্যবস্থা এবং সেবার মান উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ |
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মতামত নিয়ে সেবা পরিকল্পনা করা হলে এমন অনেক বাধা সামনে আসতে পারে, যা অন্যভাবে সহজে বোঝা সম্ভব নয়।

পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার | মানুষের অভিজ্ঞতাকে শুধু আবেগপূর্ণ গল্প হিসেবে নয়, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের মূল্যবান জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে |

সহমর্মিতা হোক আমাদের অঙ্গীকার
Let Empathy Be Our Commitment

প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ | কারও কষ্টকে ছোট করে দেখা, তাঁর কথা না শুনে সিদ্ধান্ত দেওয়া কিংবা সাহায্য চাইতে নিরুৎসাহিত করা উচিত নয় |
আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের কথা শোনা মানে শুধু নীরবে উপস্থিত থাকা নয়  তাঁর অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা, প্রয়োজন বুঝতে চেষ্টা করা এবং যথাযথ সহায়তার ব্যবস্থা করাও এর অংশ |
একজন পরিবারের সদস্য, একজন শিক্ষক, একজন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কিংবা একজন প্রতিবেশী প্রত্যেকেই সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন | আর পেশাগত দায়িত্বের ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার সীমা জানা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ |
 আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করি, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা লজ্জার বিষয় হবে না যেখানে মানুষের অভিজ্ঞতা শোনা হবে, মতামতকে মূল্য দেওয়া হবে এবং সেবার মান উন্নয়নে তা কাজে লাগানো হবে |
অভিজ্ঞতার কথা হোক শোনা, বাস্তব পরিবর্তন আসুক সবার জীবনে |
Lived Experiences Heard : Real Voices, Real Change.
মানুষকে শুনুন | সহমর্মিতা দেখান | প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।

 

লেখক: মনজুরুল মা আবুদ, এমপিএইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য), এমকম (হিসাববিজ্ঞান) রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট।