প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:৪৩ (রবিবার)
জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' প্রাসঙ্গিক

স্বাধীন বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'আমার সোনার বাংলা' গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ দেশের মানুষের প্রাণ আজও এই গানটি গাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠে। এই গান প্রথম লেখা হয় ১৯০৫ খ্রীষ্টিয় সালে। তখন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বাংলা ছিলো বিশাল আয়তনের। এই গানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে একটু ঘুরে আসলে দেখা যায় ১৯০৫ খ্রীষ্টিয় সালের বঙ্গভঙ্গ ( যা বিশালায়তনের বাংলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত ব্রিটিশরা নেয়) আন্দোলনের সময় বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ ও বৃহৎ বঙ্গদেশের প্রতি দেশপ্রেম জাগানোর উদ্দেশ্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানটি রচনা করেছিলেন। আমার মনে হয় রচনা করেছিলেন না-বলে রচনা করেছেন বললেই ভালো শোনায়। কারণ, বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই গানটি অর্থাৎ গানের প্রতিটি কথা বাংলাদেশের নিসর্গকে সমানভাবে ধারণ করে চলেছে।


অনেকে আমাদের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যাশিত অখণ্ড বাংলার সময়ের লেখা গান এখানে খন্ডিত বাংলা চলতে পারে না অথবা কেউ কেউ বলতে চান গানের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বাংলাদেশের নয়, তাঁর লেখা গান কেন আমাদের জাতীয় সংগীত হবে! বিষয়টি বুঝতে হলে সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পিছনে ফিরে দেখতে হবে। জানা আছে, পলাশীর যুদ্ধ হয় ১৭৫৭ খ্রীষ্টিয় সালে এবং এরপর সুবা বাংলা 'বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর আমরা ব্রিটিশ-ভারত বললে ব্রিটিশ শাসিত ভারত উপমহাদেশের কথা বুঝি। এই ব্রিটিশরা রাস্তা ও যা-কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে তা তাদের স্বার্থের জন্য। তবে ব্রিটিশরা যে নির্বিঘ্নে তাদের শাসন চালিয়েছিলো তা নয়। ব্রিটিশরা দীর্ঘ প্রায় দুইশো বছর বাংলা তথা ভারত শাসন করতে গিয়ে সবসময়ই ক্ষমতা হারানোর ভয় তাদেরকে তাড়িত করতো। সেজন্যে তারা বঙ্গভঙ্গসহ নানান রকম পদক্ষেপ নিয়েছিলো। তারা শুধু বাংলায়ই ফকির বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন এবং সিপাহী বিদ্রোহ মোকাবেলা করেছে। সেসব অনেক দীর্ঘ ইতিহাস। এখানে আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো আমাদের জাতীয় সংগীতের প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে। ভারত উপমহাদেশের 'বঙ্গভঙ্গ' প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমে মনে রাখতে হবে এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বড়ো প্রদেশ ছিলো 'বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি' বা 'বাংলা প্রেসিডেন্সি', এটি বাংলা, বিহার, ছোটো নাগপুর ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত ছিলো। এখন আসি বঙ্গভঙ্গের আলোচনায়। তখন ওই বাংলা প্রেসিডেন্সি প্রদেশের শাসনভার একজন গভর্নর বা ছোটোলাটের উপর ছিলো। আয়তনের দিক বিবেচনায় বর্তমান সময়ের তুলনায় তখন লোকসংখ্যা অনেক কম হলেও ১৮৬৬ খ্রীষ্টিয় সালে উড়িষ্যায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সে সময়ে ব্রিটিশ সরকার দুর্ভিক্ষের কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করে। তখন ওই কমিটির অনুসন্ধানে উঠে আসে বিশাল আয়তনের প্রদেশ চালানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নানান রকম অসুবিধার কথা। এতো বড়ো আয়তনের একটি প্রদেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সত্যি সত্যিই খুব কষ্টকর ছিলো। তাই বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা শেষে এক সময়ের বড়োলাট লর্ড কার্জন বাংলা প্রেসিডেন্সি ভেঙ্গে ছোটো করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর-ই প্রেক্ষিতে সেই সময় বিশাল আয়তনের এক প্রদেশ বাংলা প্রেসিডেন্সি বিভক্ত করে দুটি প্রদেশে ভাগ করা হয়। একটি প্রদেশ হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ ও আসাম নিয়ে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' প্রদেশ এবং তখন এর রাজধানী স্থাপন করা হয় ঢাকা, আর অপর প্রদেশ হয় পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে যা 'পশ্চিম বাংলা' প্রদেশ এবং রাজধানী তখন কলকাতাতেই। ইতিহাসে ইহা-ই বঙ্গভঙ্গ, যা ১৯০৫ খ্রীষ্টিয় সালের ১৬ ই অক্টোবর বাস্তবায়িত হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ চাননি। সেজন্যে তিনি দেশপ্রেমের আবেগ থেকে 'আমার সোনার বাংলা' রচনা করেন। সে যা-ই হোক এভাবে বঙ্গভঙ্গের ফলে এ অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিপরীত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্য হয়। মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানালেও হিন্দুরা বিরোধিতা করে। তুমুল আন্দোলনের ফলে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে ১৯১১ খ্রীষ্টিয় সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও, সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকগণের কথায় উঠে এসেছে, সেই যে বঙ্গভঙ্গ হয়েছিলো এতে বাংলা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এর প্রভাব পড়েছিলো বহুদূর বিস্তৃতি নিয়ে। একটা ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়, ঐতিহাসিক ওই বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলার মুসলমানরা অধিকার সচেতন ও অধিকার বিষয়ে আরও অধিক সোচ্চার হয়ে উঠেছিলো। এর পরবর্তী পরিস্থিতি ভারত-ভাগে স্পষ্ট হয়ে উঠে।


আলোচ্য প্রসঙ্গ, আমাদের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' মনে রেখেই 'বঙ্গভঙ্গ' ও 'বঙ্গভঙ্গ রদ' নিয়ে ইতিহাসের দিকে গভীর মনোযোগ দিলে দেখা যায় বঙ্গভঙ্গ হয়েছে দুইবার। প্রথম ভঙ্গ যা ১৯০৫ খ্রীষ্টিয় সালের তা ঠেকানো গেলেও দ্বিতীয় বারের ভঙ্গ মারাত্মক ক্ষত তৈরি করেছে এবং আর ঐক্য সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়বার বঙ্গভঙ্গ হয় ১৯৪৭ খ্রীষ্টিয় সালে। পূর্ববঙ্গ তখন পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায় আর পশ্চিম বঙ্গ ভারতের। পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান হলেও, দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম একটি নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। একটু থেমে চিন্তা করে দেখি, এই-যে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ড সেটি কিন্তু হঠাৎ গজিয়ে উঠেনি। এটি সেই 'বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি' বা 'বাংলা প্রেসিডেন্সি' যা ছিলো বৃহৎ বাংলা সেই বাংলার বৈশিষ্ট্য নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে গড়ে উঠা এবং দৃঢ় ভিত্তি নিয়ে সেই তখন থেকেই সেই মাটি, সেই আকাশ, সেই ছায়া, সেই রোদ, সেই ফাগুনের আমের বন, এখনও সেই সুর, সেই বাংলার বাঁশী বাজে এবং সেই বাংলার মানুষের মতো এই সময়ের স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের প্রাণে দোলা লাগে। আহা! কি চমৎকার ছন্দ! আহা! কি চমৎকার সুর! আমাদের জাতীয় সংগীত: "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...।" জানা যায়, এই গানের সুর নেয়া হয়েছে বাউল শিল্পী গগন হরকরার গান "আমি কোথায় পাবো তারে" গানটি থেকে। এটা কোনো সমস্যা নয়। সুর উম্মুক্ত। এখানে আরেকটু জেনে রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি প্রথম প্রকাশ হয়েছে তৎকালীন সঞ্জীবনী পত্রিকায় ১৯০৫ খ্রীষ্টিয় সালের সেপ্টেম্বর মাসে। আরেকটি বিষয় জেনে রাখা দরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি পুরোটাই আমাদের জাতীয় সংগীত নয়। ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওই গানের প্রথম দশ লাইন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং এটি ১৯৭২ খ্রীষ্টিয় সালের ১৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন পায়। আরেকটু পরিস্কার করে বলা যায়, ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালের ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় প্রথম গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার) এটি জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ খ্রীষ্টিয় সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে গানটির প্রথম ১০ লাইন জাতীয় সংগীত হিসেবে গাওয়া এবং প্রথম ৪ লাইন যন্ত্রসংগীতে বাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ১৯৭২ খ্রীষ্টিয় সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদে যখন বাংলাদেশের মূল সংবিধান গৃহীত ও পাস হয়, তখন সংবিধানের ১ম ভাগের ৪(১) অনুচ্ছেদে জাতীয় সংগীতের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুধু বৃহৎ বঙ্গ নয়, বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংগীত হিসেবে 'আমার সোনার বাংলা' খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


যাদের মনে মাঝেমধ্যে আমাদের জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধতে উঁকিঝুঁকি দেয়, আমরা যদি একটু সময় নিয়ে গানের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনি এবং আমাদের বাংলাদেশের নৈসর্গিক বৈশিষ্ট্যের দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখি, তাহলে দেখতে পাই অগ্রহায়ণ মাসে, ফাগুন মাসে সকল সময়ে এ দেশের মানুষের মনে যে মায়া, যে স্নেহ, যে ভালোবাসা, যে সম্প্রীতি বিরাজ করে তারই প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের জাতীয় সংগীতে। আমাদের রূপসী বাংলার নদী, জল, আকাশ, ষড়ঋতু এবং মানুষের মধ্যে যে মিলেমিশে চলার আকুতি, সেদিক বিবেচনায় আমাদের জাতীয় সংগীতের প্রাসঙ্গিকতা বঙ্গভঙ্গের সাথে সাথে টুটে যায়নি; বরং এই বাংলাদেশের জন্য এই গান বাঙালির প্রাণের স্পন্দন ও প্রয়োজনে বৃহৎ বঙ্গের দৃঢ় ঐক্যের এক কৌশলীভাবে পরোক্ষ আহ্বান।

 

লেখক: মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক।