জাতীয়করণ, ন্যায্য বেতন ও অবসরসুবিধা নিশ্চিত করতে চাই কার্যকর উদ্যোগ।
বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজ রাজপথে আন্দোলন করতে চায় না; তাঁরা চান ন্যায্য অধিকার, পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা। কিন্তু দীর্ঘদিন দাবি উপেক্ষিত হলে, বদলি আটকে থাকলে এবং অবসরভাতা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হলে শিক্ষকদের সামনে আন্দোলন ছাড়া আর কী পথ খোলা থাকে?
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আমার বিনীত আহ্বান—শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় বসুন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করুন। আগামী চার বছরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য সরকারের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করুন এবং পর্যায়ক্রমে সমস্যাগুলোর সমাধান করুন। আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষকদের রাজপথে নামার প্রয়োজন হবে না, ইনশাআল্লাহ।
আলোচনা হয়, বাস্তবায়ন কোথায়?
শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আমারও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। গত সরকারের আমলে জাতীয় প্রেসক্লাবে টানা ৪৪ দিন অবস্থান ও অনশন কর্মসূচি পালন করেছি। ১১২ জন মন্ত্রী-এমপির কাছে শিক্ষকদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছি। মহান জাতীয় সংসদেও ১২ জন মন্ত্রী-এমপি শিক্ষকদের পক্ষে কথা বলেছেন। বর্তমানেও সংসদে শিক্ষকদের দাবি নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত আলোচনা ও প্রচেষ্টার পরও সমস্যার কার্যকর।
সমাধান হয় না কেন?
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনেক উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে। বদলি, অবসরভাতা ও অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা পেতে শিক্ষকদের হয়রানি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।
সীমিত বেতনে বিশ্বমানের শিক্ষা কতটা সম্ভব?
আমরা বিশ্বমানের শিক্ষা চাই, দক্ষ ও যোগ্য প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু যাঁদের কাঁধে এই গুরুদায়িত্ব, তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত না করে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন কতটা সম্ভব?
এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষক সীমিত বেতনে সংসার চালাতে হিমশিম খান। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসবভাতা ও অবসরসুবিধার মতো বিষয়েও তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ হয় না। একজন শিক্ষককে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে তাঁর কাছে সর্বোচ্চ পেশাগত সাফল্য প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
প্রচলিত এমপিও ব্যবস্থার পরিবর্তে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়ে সরকারকে সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর্থিক সক্ষমতা, বাস্তবায়নের ধাপ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করে একটি কার্যকর রূপরেখা ঘোষণা করা প্রয়োজন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে
জনপ্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো যৌক্তিক আবেদন যেন অকারণে মাসের পর মাস পড়ে না থাকে। ফাইল নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ এবং অযৌক্তিক বিলম্বের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
আমলাদের পরামর্শ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কেবল দাপ্তরিক প্রতিবেদন নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রতিশ্রুতি নয়, চাই বাস্তবায়ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার গঠনের পর অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায় না। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষকদের সব দাবি একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব না হলেও অগ্রাধিকারভিত্তিতে একটি একটি করে সমস্যার সমাধান করা যায়। এ জন্য বছরে অন্তত এক-দুবার শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে সমস্যাগুলো পর্যালোচনা, অগ্রগতি মূল্যায়ন ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষকদের আন্দোলনকে সমস্যা হিসেবে না দেখে তাঁদের দাবির পেছনের বাস্তবতাকে অনুধাবন করুন। শিক্ষকরা রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নন; তাঁরা জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর। তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ করা সরকারের দায়িত্বেরই অংশ।
বক্তৃতা নয়, চাই বাস্তবায়ন; আশ্বাস নয়, চাই কার্যকর পদক্ষেপ। জাতীয়করণের রূপরেখা ঘোষণা করুন, অবসরসুবিধা ও বদলিসংক্রান্ত জটিলতা দূর করুন এবং শিক্ষকদের আর্থিক মর্যাদা নিশ্চিত করুন।
শিক্ষকদের রাজপথে নামতে বাধ্য করার পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে তাঁদের সমস্যার সমাধান করুন। কারণ শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন, আর মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে না।
লেখক: মো. রুহুল আমিন, সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, জাফলং, গোয়াইনঘাট, সিলেট।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.