ছবি: সিলেট ভিউ।
সিলেট সরকারি মদন মোহন কলেজ থেকে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক শাখা থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তার মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র একটি। আর সেই সবে ধন নীল মণি হচ্ছে জন্মান্ধ তাহমিনা আক্তার মৌমি।
মৌমি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের পশ্চিম জায়ফরনগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আহাদ ও আমিনা আক্তার পুষ্প দম্পতির বড় মেয়ে।
মৌমির দৃষ্টিশক্তি না থাকায় শ্রুতিলেখকের মাধ্যমে তাকে পরীক্ষা দিতে হয়। এইচএসসি পরীক্ষা শ্রুতিলেখক হিসেবে তাকে সহযোগিতা করেন হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি উত্তীর্ণ পল্লব রায়। মৌমির বলা উত্তর গুলো সুচারুরূপে খাতায় ফুটিয়ে তুলে তার এই সাফল্যের জন্য মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন পল্লব।
মৌমির বাবা মুদি দোকানী আব্দুল আহাদ এর একমাত্র ছেলে ঢাকায় অনার্স ২য় বর্ষে ও ছোট মেয়ে ৫ম শ্রেণিতে পড়ছে। তিনি জানান, জন্মের পর থেকেই মৌমি দুই হাত দিয়ে দুই চোখ ঢেকে রাখতো। প্রথমে বিষয়টি আমরা স্বাভাবিক ভাবেই নেই। তার চোখের চাহনিসহ সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিছু দিন পর তার চোখের সামনে খেলনা ধরে ঘুরানোর পর বুঝতে পারলাম তার দৃষ্টি খেলনার দিকে ঘুরছে না বা কোনো প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে দেখা যায়নি। তখন আমাদের সন্দেহ হল। এরকম বিভিন্ন ভাবে পরখ করে দেখলাম তার চোখ দেখানো বস্তুর দিকে যাচ্ছে না। তখন সন্দেহটা আরো বেড়ে যাওয়ায় তাকে ঢাকায় চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাই। তিনি পাঠিয়ে দেন চট্টগ্রাম পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে। সেখানকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন মৌমির চোখে আলো নেই, তার আলো আর ফিরবে না। আমরা স্বামী স্ত্রী দু’জন আমাদের দুইটি চক্ষু দিতে চাইলেও ডাক্তারগণ তাতে রাজী হননি। তারা পরিস্কার বলে দিলেন বিশ্বের কোথাও তার কোনো চিকিৎসা হবে না। তার ভবিষ্যতের জন্য তার নামে ব্যাংকে একটি ডিপজিট করার কথা বললেন এবং মৌমিকে কোনো প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ভর্তি করার পরামর্শ দিলেন।
৭ বছর বয়সে ২০১৩ সালে তাকে সিলেটের জিন্দাবাজারস্থ ‘গ্রীণ ডিজেবল ফাউন্ডেশন’ (জিডিএফ) এ ভর্তি করে দেই। ভর্তি ফি ৫ হাজার টাকা, প্রতি মাসে থাকা খাওয়া ও পড়ালেখাসহ ২০০০ টাকা ফি। সেখানে থেকে মৌমি লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নিত। সে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতে পারে। সিলেট বেতারে খুদে শিল্পীদের মধ্যে সে প্রথম হয়েছিল। সর্বশেষ ৪/৫ বছর থেকে তার আর কোনো ফি দিতে হয়না।
ফোনালাপে মৌমি জানায়, সে ২০২৪ সালে এসএসসিতে এ গ্রেড পেয়েছিল। এইচএসসির ফলাফল জানার পর কলেজে স্যারদের সাথে দেখা করতে গেলে কলেজের প্রিন্সিপাল তাকে জানান অত্র কলেজের মানবিক শাখার ৫শত পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র সেই এ+ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার ইচ্ছা সে একজন ব্যাংকার হবে এবং তার মতো আলোহীন ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সেবা করবে। মৌমি বলেন, চোখে আলো না থাকায় দেখতে পারি না। কিন্তু স্বপ্নতো দেখতে পারি!
মৌমির এ সাফল্যে গর্বিত তার পিতা আব্দুল আহাদ বলেন, আল্লাহ আমার মেয়েকে চোখ দেননি, কিন্তু তাকে মেধা দিয়েছেন। এজন্য আমরা শুকরিয়া আদায় করি। তার স্বপ্ন পুরণের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করা গ্রীণ ডিজেবল ফাউন্ডেশন, সিলেট এর নির্বাহী পরিচালক বায়েজিদ আহমদ খান বলেন, মৌমি আমাদের প্রতিষ্ঠানের আবাসিক শিক্ষার্থী। আমরা তাকে শিশু শ্রেণি থেকে লালন-পালন করে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। মৌমির এই সাফল্য আমাদের জন্য গর্বের। সে ব্যাংকার হতে আগ্রহী। আমরা তাকে ভালো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর চেষ্টা করছি। মৌমির চোখে সৃষ্টিকর্তা আলো দেননি। কিন্তু তাকে যথেষ্ট মেধা দিয়েছেন। মেধাকে কাজে লাগিয়ে কোনো প্রাইভেট না পড়েই সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফলাফল করে সে চতুর্দিকে আলো ছড়াচ্ছে। পৃথিবীর রূপ-সৌন্দর্য সে দেখতে না পেলেও তার অর্জিত ফলাফলের গল্প শোনে আজ শত শত মানুষ তাকে এক নজর দেখতে চাচ্ছেন। জন্মগত দৃষ্টিহীনতার কাছে সে হার মানেনি। প্রতিবন্ধীতা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে সে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার পরিবার তাকে উৎসাহিত করছেন। তার প্রতিষ্ঠান গ্রীণ ডিজেবল ফাউরন্ডশন, সিলেট তার জন্য সব কিছু উজাড় করে দিচ্ছেন। সে প্রমাণ করেছে সহযোগিতা পেলে সাহস ও ইচ্ছা শক্তিকে কেহ দাবাতে পারে না। তার স্বপ্ন পুরনের জন্য মৌমি সবার কাছে দোয়া কামনা করেছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/মঞ্জুরে/আশিক-২৩
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.