প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ ০০:০০ (শুক্রবার)
অস্তিত্ব সংকটে সিলেটের দিঘি

সিলেটের ইন্দ্রানী দিঘি

এক সময় অসংখ্য পুকুর ও দিঘির কারণে সিলেট পরিচিত ছিল ‘দিঘির শহর’ নামে। তবে সাগরদিঘি, লালদিঘি, বেকা দিঘি, যতরপুর দিঘি, ইন্দ্রানীর দিঘি, কাজলশাহ দিঘি, লালাদিঘির সেই ঐতিহ্যের বড় অংশ এখন ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। এখনো যেসব দিঘির অস্তিত্ব টিকে আছে সেগুলোর বেশিরভাগই দূষণের শিকার। ভরাট, দখল, দূষণ আর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে আজ সেসব যেন হারিয়ে যাওয়া রূপকথা!


অপরিকল্পিত নগরায়ন আর ভূমিখেকো চক্রের গ্রাসে নগরী থেকে হারিয়ে গেছে দিঘি। ফলে একদিকে যেমন সিলেটের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য নষ্ট হচ্ছে অপরদিকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কমে আসায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরীতে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও যাচ্ছেতাই। তাতে নগরবাসী হাঁসফাঁস করে প্রতি বর্ষাতে। অথচ একসময় সিলেটের প্রতিটি পাড়ায়ই ছিলো একেকটি দিঘি।


সিলেট নগরীতে এখনও যেসব দিঘির অস্তিত্ব টিকে আছে সেগুলোর বেশিরভাগই দূষণের শিকার। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) উদ্যোগে কিছু দীঘি উদ্ধার করে বেষ্টনি দেওয়া হলেও দূষণের কারণে সেগুলোর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া অরক্ষিত অবস্থায় থাকা দিঘিগুলো দিন দিন বেদখল হচ্ছেই। কিছু দিঘি ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় উঠেছে আকাশচুম্বী দালান, কিছু স্থানে দিঘি ভরাট করে হয়েছে পার্ক, মার্কেট, মসজিদ বা স্কুল।


গত তিন দশকের হিসেবে সিলেট শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি পুকুর ও দিঘি ছিল। বর্তমানে সিসিকের সরকারি হিসাবে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮টিতে। অথচ সিলেটকে চেনা হতো দিঘির নগর। ইতিহাসের পাতায় একসময় জলাধারের নগর হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এই শহর এখন যেন অতীতের কঙ্কাল!


যদিও সম্প্রতি সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী নগরীর দক্ষিণ সুরমা এলাকার খোজারখলা দিঘি উদ্ধারে শুরু করেন বহু প্রতীক্ষিত অভিযান। দীর্ঘদিনের অবহেলা, কচুরিপানা ও আবর্জনার দখলে হারিয়ে যাওয়া দিঘিটি এখন আবার নতুন আশার আলো দেখছে। পাশাপাশি কুমারগাঁও বাসস্টেশন সংলগ্ন দিঘি ও ঘাসিটুলা দিঘি উদ্ধার করা হয়েছে।


সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান সিলেটভিউ-কে বলেন, “দিঘির শান্ত জল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, নগরজীবনে প্রশান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তপ্ত নগরীতে দিঘির শীতল বাতাস ক্লান্ত মানুষকে স্বস্তি দেয়, তৃষ্ণার্ত পাখিদের আশ্রয় জোগায়। অথচ অবহেলা, দখল ও দূষণের কারণে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দিঘিগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। একের পর এক জলাধার হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি ঐতিহ্যের বিলুপ্তি নয়, বরং নগরীর পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্যও বড় হুমকি। তাই সিলেটের অবশিষ্ট দিঘিগুলো রক্ষা, দখলমুক্ত ও দূষণমুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার এবং সিসিক প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা জলাশয়গুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ‘দিঘির শহর’ সিলেট কেবল ইতিহাসের গল্প হয়েই থেকে যাবে।”


সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “একসময় নগরীতে প্রচুর দিঘি, পুকুর ও জলাশয় ছিল। যা মানুষের উপকারে আসার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করত। আমরা চাই জলাশয়গুলো যথাসম্ভব পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। এর ধারাবাহিকতায় উদ্ধার কাজ শুর হয়েছে। এসব জলাশয় উদ্ধারের পর চারপাশে ওয়াকওয়ে ও সুরক্ষা রেলিং স্থাপন করা হবে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে নগরবাসী পুকুরপাড়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন।”

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/আশিক-১২