দীপাবলি ও শ্যামাপূজা (কালীপূজা) বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এটি কেবল আলোকসজ্জা বা আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং ভক্তি, বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক সাধনা, অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরার প্রেরণা এবং মানবিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা। আশ্বিন-কার্তিকের আমেজ, প্রদীপের স্নিগ্ধ শিখা, সুগন্ধি ধূপ আর ঢাক-কাঁসরের ছন্দময় বাদ্য বাঙালির হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে এক অপার্থিব আনন্দের অনুভূতি। মায়ের চরণে ভক্তিপুষ্পাঞ্জলি, সুমধুর শ্যামাসংগীত, কাঁসর-ঘণ্টার অনুরণন ও আরতির মঙ্গলালোকে পূজামণ্ডপ হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক চেতনার এক পবিত্র প্রাঙ্গণ। এসব ধর্মীয় অনুষঙ্গের মধ্যেই নিহিত রয়েছে কালীপূজার চিরন্তন সৌন্দর্য, স্বকীয়তা ও ভাবগাম্ভীর্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো কোনো পূজামণ্ডপ ও আলোকসজ্জায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চিরায়ত ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে মাত্রাতিরিক্ত উচ্চ শব্দে গান বাজানো, ডিজে মিউজিক এবং বিশেষ করে শব্দবাজি ও আতশবাজির বিকট শব্দ এক উদ্বেগজনক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। উৎসবের আনন্দ প্রকাশের নামে নিষিদ্ধ পটকা বা ফোটার শব্দ ও আতশবাজির তাণ্ডব পূজার পবিত্র পরিবেশকে ব্যাহত করছে। ফলে শ্যামাসংগীতের সুর, ঢাকের ঐতিহ্যবাহী ছন্দ এবং প্রদীপের স্নিগ্ধ আবহ অনেক সময় চাপা পড়ে যায় যান্ত্রিক শব্দের দাপটে। অথচ ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত উদ্দেশ্য কখনোই বাহ্যিক আড়ম্বর, আলোর ঝলকানি কিংবা পটকার তীব্রতা প্রদর্শন নয়; বরং অন্তরের অন্ধকার দূর করে শুভচেতনার বিকাশ ঘটানো।
ধর্মের মূল শিক্ষা মানবকল্যাণ, সংযম, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার, তেমনি অন্যের শান্তি, স্বস্তি ও সুস্থতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উদযাপনের অংশই অন্যের কষ্ট কিংবা দুর্ভোগের কারণ হওয়া উচিত নয়। আতশবাজি ও বিকট শব্দবাজি শুধু কানফাটা আওয়াজই তৈরি করে না, বরং মারাত্মক বাতাস ও শব্দদূষণ ঘটায়।
এ ধরনের শব্দদূষণ ও রাসায়নিক ধোঁয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি, হৃদরোগী ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য এই তীব্র শব্দ ও ধোঁয়া প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এতে ছোট শিশুদের কান ও গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি রাস্তার পশুপাখিরা আতশবাজির শব্দে তীব্র আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। অন্যের ক্ষতি করে আনন্দ উদযাপিত হতে পারে না, এবং তা ধর্মও সমর্থন করে না।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কালীপূজার সঙ্গে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, ঢাক, কাঁসর, ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এসব অনুষঙ্গ আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ঢাকের প্রতিটি ছন্দে এবং আরতির প্রতিটি মুহূর্তে মিশে থাকে ভক্তির নিবিড় অনুভূতি। তাই ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানকে নিরুৎসাহিত করা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় বিকট শব্দবাজি, আতশবাজি, উচ্চশব্দের ডিজে মিউজিক ও অনিয়ন্ত্রিত সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার পরিহার করাই হওয়া উচিত আমাদের সচেতনতার মূল লক্ষ্য।
কালীপূজা ও দীপাবলি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক সৌহার্দ্যেরও এক উজ্জ্বল প্রতীক। পূজামণ্ডপ ও আশেপাশে বসবাসকারী সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের শান্তি ও স্বস্তির বিষয়টি সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ প্রকৃত সম্প্রীতি শুধু উৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একে অপরের অনুভূতি, প্রয়োজন ও অধিকারকে সম্মান করার মধ্যেই তার যথার্থ প্রকাশ ঘটে।
এ ক্ষেত্রে পূজা উদযাপন সংক্রান্ত কমিটি, পরিবার, পরিচালনা পর্ষদ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সচেতনতার মাধ্যমেই আমরা তা রোধ করতে পারি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী দীপাবলির তাৎপর্য, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং শব্দবাজির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা দরকার।
মনে রাখতে হবে, উৎসবের মহিমা শব্দের তীব্রতা বা ধোঁয়ার কুয়াশায় নয়, ভক্তির গভীরতায়; দীপাবলির সার্থকতা অনাকাঙ্ক্ষিত আতশবাজির তাণ্ডবে নয়, বরং অন্তরের আলো জ্বালানোয় এবং মানবিকতায়। আধুনিকতা বা বিনোদনের জন্য ধর্মীয় উৎসব নয়। আনন্দের নামে ধৰ্মীয় উৎসবের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ম্লান করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আনন্দ হোক প্রাণবন্ত, কিন্তু তা যেন উচ্ছৃঙ্খলতায় রূপ না নেয়; উৎসব হোক আলোকময়, কিন্তু তার স্থায়িত্ব যেন অন্যের জীবনে দুর্ভোগের অন্ধকার ডেকে না আনে।
আসুন, কালীপূজায় ফিরিয়ে আনি ভক্তিমূলক শ্যামাসংগীত, মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলো, ঢাক- কাঁসরের মধুর অনুরণন ও পবিত্র পরিবেশ। বর্জন করি বিকট শব্দবাজি, ক্ষতিকর আতশবাজি ও শব্দদূষণের অনাকাঙিক্ষত তাণ্ডব। মা কালীর আরাধনা আমাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলুক শুভবোধ, কল্যাণচেতনা ও সকলের প্রতি সহমর্মিতা। ধর্মীয় পবিত্রতা ও ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
কালীপূজা হোক ভক্তি, সংস্কৃতি, শান্তি ও আলোকময় সম্প্রীতির মহোৎসব—শব্দদূষণ, আতশবাজির তাণ্ডব ও জনদুর্ভোগের নয়।
লেখক: প্রতাপ চৌধুরী, সহকারী পরিচালক (সহযোগী অধ্যাপক), মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা, সিলেট অঞ্চল।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.