আব্দুল বাছিত বাচ্চু :: এডভোকেট শামছুজ্জান জামানের বিএনপি ছাড়ার বিষয়টি এখন "টক অব দ্যা সিলেট"। নিজ শহরে দীর্ঘ ৩৫ বছরে শ্রমে ঘামে গড়ে তোলা তার প্রিয় সংগঠন বিএনপি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন বৃহস্পতিবার। এডভোকেট জামানের আকস্মিক এই ঘোষণার পর সিলেটের রাজনৈতিক মহলে নানা হিসেব নিকেশ চলছে। বিশেষ করে রাজনীতির মাঠে বিএনপির লাভ ক্ষতি আর জামানের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে। তবে বড় ক্ষতি যে বিএনপির তাতে দ্বিমত নেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। ১৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলন করে দল ছাড়ার এই ঘোষণা দেন এডভোকেট শামছুজ্জান জামান।
সিলেট জেলা ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন নিয়ে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানান শামছুজ্জান জামান।
তিনি দাবি করেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নিজ জেলার কমিটি করার সময় তার মতামত নেওয়ার কথা। কিন্তু বার বার আলোচনা করার পরও কেন্দ্রীয় বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দল কমিটি গঠনের সময় তার দাবি ও যৌক্তিক কিছু পরামর্শ উপেক্ষা করেছে। আর এতে অনেক ত্যাগী ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি কয়েকজনকে নাম মাত্র দায়িত্ব দিয়ে কমিটিতে রাখা হয়েছে। তিনি এটাকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে দাবি করছেন। শামছুজ্জান জামান অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ ও প্রাঞ্জল ভাষায় অভিমত ব্যক্ত করেন হয়তো বিএনপি এখন দলে তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে না বলে এমনটি করা হয়েছে। তাই নিজে থেকে তিনি দল থেকে সরে দাড়াচ্ছেন।
সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে এক মুকুটহীন সম্রাট এডভোকেট শামছুজ্জান জামান। আওয়ামী লীগের ঘাটি খ্যাত সিলেটে বিএনপির রাজনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, নিখোঁজ সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর পর তৃতীয় কারো নাম জিজ্ঞেস করলে যেকোনো লোক অবশ্যই বলবো শামসুজ্জামান জামানের নাম। কারণ নিজে সামনে থেকে দেখেছি দলের জন্য তার অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা আর নেতৃত্বগুন।
বয়সের দিক থেকে আমরা সমসাময়িক। স্টাডি ব্রেক হওয়ার কারণে হয়তো ৬/৭ বছরের ব্যবধান। ১৯৮৪/৮৫ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল এবং ২০০০ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ছিলাম সিলেট শহরে। মাঝে দুটিবছর অবশ্য উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে। আর সাংবাদিকতার জন্য কয়েক বছর কুলাউড়ায়।
১৯৮৬ সালে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ বিএনপিকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ, জামাত জাসদ, সিপিবিসহ বাম ও কয়েকটি ইসলামি দল নিয়ে একটি আতাতের নির্বাচন আয়োজন করে। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে ১৯৮ আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিনত হয়। পরে মুসলিম লীগের ৩ জন সংসদ সদস্যকে ভাগিয়ে নিয়ে জাতীয় পার্টি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এমন শক্তিশালী সরকার আর প্রশাসনের সকল উইংস নিয়ে এরশাদ যখন বিএনপিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তখন ব্যারিস্টার মওদুদসহ বিএনপির অনেক বাঘা বাঘা নেতা ক্ষমতার লোভে বিএনপি ছেড়ে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। কঠিন দুর্যোগে পড়ে বিএনপি। এমনি এক সময়ে সারাদেশে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বিএনপিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে আনার মিশনে নামে। ১৯৮৭ সালে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশে তীব্র গণ আন্দোলন গড়ে উঠে। এসময় ঢাকার রাজপথে যেমন ছিলেন আমান উল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন, নাজিম উদ্দিন আলম, রুহুল কবির রিজভী, এম ইলিয়াস আলী, ফজলুল হক মিলনের মতো নেতারা; ঠিক তেমনি সিলেটের রাজপথে ছিলেন শামছুজ্জান জামান এর মতো ত্যাগী অনেক নেতা। আন্দোলন এতই তীব্র ছিলো জাতীয় সংসদ থেকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর এমপিরা পদত্যাগ করে আন্দোলনে নামেন। এমনকি এরশাদ সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্যমন্ত্রী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তথ্যমন্ত্রী আনোয়ার জাহিদও পদত্যাগ করেন। সরকারের এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে এবং সংবিধান স্থগিত করে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। সেসময় আন্দোলন পুরোপুরি সফল না হলেও দেশের অধিকাংশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল একক সংগঠনে পরিনত হয়। আর শামসুজ্জামানের মতো ত্যাগী নেতাদের কারণেই তা সম্ভব হয়েছিলো। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি জিএস সহ পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করে ছাত্রদল। একইভাবে চাকসু, রাকসুসহ দেশের বেশীরভাগ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল বিজয়ী হয়।
পাশাপাশি শুরু হয় সরকার বিরোধী তীব্র ছাত্র আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায় গণ আন্দোলন এবং পরে গণ অভ্যুত্থান। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা এরশাদ তীব্র গণ আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর দল নিরপেক্ষ ব্যক্তির কাছে ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ৬ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রধান বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদ শপথ নেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। যেখানে ৩০০ টি আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি বিএনপি সেখানে ১৪৭ টি আসনে জয়লাভ করেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। যা ছিলো জামানের মতো ছাত্রদল নেতাদের ত্যাগ তিতিক্ষা আর পরিশ্রমের ফসল। যে কারণে ২০০৪ সালে মতিঝিল শাপলা চত্ত্বরে ছাত্রদলের এক ছাত্র-গণ জমায়েতে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন বিরোধী দলের অযৌক্তিক আন্দোলন মোকাবেলায় আমার ছাত্রদলই যথেষ্ট।
২০০১ সালে বিএনপি আবারও সরকারে আসে। কিন্তু এজেনো এক নতুন বিএনপি। শুরু হয় "দুধ খাওরা মজনু" স্বার্থের জন্য দলে আসা লোকদের প্রভাব। শামসুজ্জামান জামান ১৯৯৮ সালে দলের কাউন্সিলে বিপুল ভোটে সিলেট বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপি জাসদ জাতীয় পার্টি থেকে আসা অনেক নেতা মন্ত্রী হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় জামানের মতো অনেক ত্যাগী নেতাদের দল থেকে অব্যাহতি অথবা নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। তারপরও তারা চলে যায়নি। ওয়ান ইলিভেনের সময় ফখরুদ্দীন মঈনদ্দীন আর পরে ক্ষতায় আসা আওয়ামী লীগের শত নির্যাতন উপেক্ষা করে শামসুজ্জামান জামানরা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য লড়ে যাচ্ছে।
বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী ও সচেতন রাজনৈতিক মহল মনে করে শামছুজ্জান জামানের বিষয়টি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সমাধান করে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন অন্যথায় এর কঠিন মুল্য দিতে হতে পারে সিলেট বিএনপিকে।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও গণমাধ্যম কর্মী, সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, কুলাউড়া উপজেলা বিএনপি।



