এটিএম বুথ থেকে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গত শনিবার সকাল থেকে গতকাল রবিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁদের।

র‌্যাবের ভাষ্য, এঁরা একটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের কর্মী, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে টাকা রাখা, নিরাপত্তা, কারিগরি ত্রুটির বিষয়গুলো দেখভাল করতেন। এই সুযোগে তাঁরা বুথে ‘কৃত্রিম জ্যাম’ লাগিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতেন।


এভাবে গত তিন বছরে একটি বেসরকারি ব্যাংকের দুই শতাধিক এটিএম বুথ মেশিন থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৪-এর একটি যৌথ দল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের এই আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। এঁরা হলেন বরিশালের এয়ারপোর্ট এলাকার রবিউল হাসান, গাজীপুরের কাপাসিয়ার হাবিবুর রহমান ইলিয়াস, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের সুজন মিয়া, সাতক্ষীরার দেবহাটার আব্দুল কাদের, মানিকগঞ্জের আব্দুর রহমান বিশ্বাস, যশোরের তারেক আজিজ, গাজীপুরের শ্রীপুরের তাহমিদ উদ্দিন পাঠান ওরফে সোহান ও ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরের কামরুল হাসান।

তাঁদের কাছ থেকে দুটি চেকবই, একটি এটিএম কার্ড, চারটি আইডি কার্ড, একটি স্বর্ণের নেকলেস, এক জোড়া বালা, এক জোড়া কানের দুল, একটি আংটি এবং নগদ ৯ লাখ ৪১ হাজার ৫৫৫ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ব্যাংক এটিএম বুথের ব্যবস্থাপনা থার্ড পার্টি বা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকে। থার্ড পার্টি টাকা স্থাপন, নিরাপত্তা, কারিগরি ত্রুটির বিষয়টি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি ব্যাংকের (ডাচ্-বাংলা) অডিটে এটিএম বুথের টাকার বেশ কিছু গরমিল পরিলক্ষিত হয়। ফলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থার্ড পার্টি পরিবর্তন করে। তার পরও বুথে অনিয়ম ও গরমিল পাওয়া যাওয়ায় তারা বিষয়টি র‌্যাবকে জানায়।

আল মঈন জানান, র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়া তদন্ত শুরু করে। এক পর্যায়ে র‌্যাব জানতে পারে, থার্ড পার্টি পরিবর্তন করা হলেও এটিএম বুথে টাকা লোডার ও অন্যান্য কারিগরি দলের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরে ওই চক্রের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি করে আটজনকে প্রথমে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা পরস্পর যোগসাজশে কৃত্রিম জ্যাম সৃষ্টির মাধ্যমে কয়েকটি এটিএম বুথ থেকে টাকা আত্মসাতের কথা স্বীকার করেন। এরপর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, চক্রের মূল হোতা আব্দুর রহমান। তিনি এক সহকর্মীর কাছ থেকে কৌশলটি শেখার পর একটি চক্র তৈরি করেন। তাঁরা সবাই এটিএম বুথের কন্ট্রোল রুম, লোডিং, কলিং ও মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব পালন করেন। গ্রেপ্তারকৃতরা ঢাকা শহরের ২৩১টি এটিএম বুথ মেশিনে টাকা লোড করতেন।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, চক্রটি লোড করার ট্রেতে টাকা স্থাপনের সময় ১৯টি ১০০০ টাকার নোট পর পর অথবা অন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ইচ্ছাকৃতভাবে জ্যাম করে রাখত। কোনো ক্লায়েন্ট টাকা উত্তোলনের জন্য বুথে এটিএম কার্ড প্রবেশ করিয়ে পিন নম্বর দিয়ে কমান্ড করলে ওই পরিমাণ টাকা ডেলিভারি না হয়ে পার্সবিনে জমা হতো। পরে সেই টাকা চক্রের সদস্যরা সরিয়ে নিতেন।

চক্রের প্রধান আব্দুর রহমান সম্পর্কে র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, চার বছর আগে একটি সিকিউরিটি কম্পানিতে চাকরি নেন তিনি। তাঁর দায়িত্বের এলাকা ছিল মিরপুর, কালশী, বেনারসি, সেনপাড়া, ইব্রাহিমপুর ও কচুক্ষেত।

আল মঈন বলেন, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথের টাকা লোড-আনলোডসহ মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব পালন করে গার্ডা শিল্ড নামের একটি কম্পানি। আব্দুর রহমান ওই কম্পানিতে চাকরি করতেন। গত এক বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা বুথে ‘কৃত্রিম জ্যাম’ লাগিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন আব্দুর রহমান ও তাঁর সহযোগীরা। এতে গ্রাহক ক্ষতির সম্মুখীন না হলেও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ক্ষতির সম্মুখীন হতো। রহমানের অন্তত ২০ জন সহযোগী রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, চক্রের সদস্যরা তিন বছর একসঙ্গে চাকরি করার কারণে তাঁদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/জিএসি-২৬


সূত্র : কালের কণ্ঠ