সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) রেশন স্টোরে চাকরি করা সেই রুমেনা আক্তারকে (৩১) চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে বদলি করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এক আদেশে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয় বলে সিলেটভিউ-কে জানিয়েছে এসএমপি সূত্র।

রুমেনা আক্তারের বিরুদ্ধে প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকির নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে গত ৩ মার্চ সিলেটের সর্বাধিক প্রকাশিত পত্রিকা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর তদন্ত শুরু হয় তার বিরুদ্ধে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে রুমেনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।


তবে সিলেটভিউ’র কাছে রুমেনা দাবি করেছেন, প্রথম বিয়েও পুলিশে চাকরি নেওয়ার পরে হয়েছে। হেয় করার উদ্দেশে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নতুনপাড়ার আহম্মদ আলীর মেয়ে রুমেনা আক্তার ২০১১ সালের ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি নেন। পুলিশের কনস্টেবল পদে যোগদান করতে হলে প্রার্থীকে অবিবাহিত হওয়ার নিয়ম থাকলেও রুমেনা আক্তার প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে পুলিশে যোগ দেন।

চাকরিতে যোগদানের আগে রুমেনা আক্তারের সাথে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামের আক্কাস আলীর ছেলে শামসুজ্জামানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয়। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার ও কাজি মাওলানা মো. শাহেদ আলী এক লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়েটি রেজিস্ট্রেশন করেন। বিয়েতে কনেপক্ষ থেকে ইব্রাহিমপুর গ্রামের মো. আবু বকর মিয়ার ছেলে মো. আব্দুছ ছালামকে উকিল (সাক্ষী) নিযুক্ত করা হয়। কাবিননামায় রুমেনার বাবা বিশ্বম্ভরপুরের নতুনপাড়ার মৃত ছমির উদ্দিনের ছেলে আহাম্মদ আলী ও রুমেনার চাচা মো. আব্দুছ ছামাদ কনের পক্ষে সাক্ষী হন। আর বরের পক্ষে সাক্ষী হন শামসুজ্জামানের বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম ও দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর নয়াহাটির আব্দুল মতলিবের ছেলে মো. আব্দুল মতিন। ওই কাবিননামায় বর শামসুজ্জামান ও কনে রুমেনা আক্তারের স্বাক্ষর রয়েছে।

নিকাহ রেজিস্ট্রার ও কাজি মাওলানা মো. শাহেদ আলী শামসুজ্জামান ও রুমেনা আক্তারের বিয়ের সত্যতা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

রুমেনা সম্পর্কে আরও জানা যায়, পুলিশের চাকরিতে যোগদানের পর প্রশিক্ষণে অংশ নেন তিনি। ওই সময় স্বামী হিসেবে শামসুজ্জামান রুমেনা আক্তারের ব্যয় নির্বাহের জন্য মানিঅর্ডার করে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। পুলিশে যোগদানের পর রুমেনা থাকতেন সিলেট জেলা পুলিশ লাইন্সে আর শামসুজ্জামান নিজ বাড়ি ইব্রাহিমপুরেই বসবাস করতেন। একসময় শামসুজ্জামানের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করেন রুমেনা। স্ত্রীর বদলে যাওয়ায় শামসুজ্জামান সিলেটে ছুটে আসেন। এসে শুনতে পান- রুমেনা তার এক সহকর্মীর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করেছেন। এসব শুনার পরও সংসার টিকিয়ে রাখতে রুমেনাকে শামসুজ্জামান অনেক বুঝান। কিন্তু শামসুজ্জামানকে পাত্তা দেননি রুমেনা। এক পর্যায়ে রুমেনার সঙ্গে শামসুজ্জামানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর রুমেনাকে সিলেট জেলা পুলিশ থেকে মৌলভীবাজার পুলিশ লাইন্সে বদলি করা হয়। এরপর যোগ দেন মৌলভীবাজার সদর থানায়। মৌলভীবাজার সদর থানায় যোগদানের পর ওই থানায় আগে থেকে কর্মরত সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রফিকুল ইসলাম রানা নামের আরেক জনের সাথে নতুন করে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন রুমেনা। এরপর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট এএসআই রফিকুলের সাথে রুমেনা আক্তারের দ্বিতীয় বিয়ে হয়। সুনামগঞ্জ শহরের রুমেনার এক বোনের বাসায় ওই বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই সংসারে তাদের এক ছেলেসন্তানও রয়েছে।

পরবর্তীতে মৌলভীবাজার থেকে বদলি হয়ে সিলেট জেলা পুলিশে আসেন রুমেনা। এরপর ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) হেডকোয়ার্টার্স এন্ড অ্যাডমিন বিভাগে (সাপ্লাই/রেশন স্টোরে) তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে সম্প্রতি চট্টগ্রামে বদলি কারা আগ পর্যন্ত টানা ৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে বহাল তবিয়তে চাকির করে গেছেন। তবে গণমাধ্যমে প্রথম বিয়ের খবর প্রকাশিত হওয়া রুমেনা আক্তার বেশ বেকায়দায় পড়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ ও বদলির বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রুমেনার মুঠোফোনে কল দিলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিলেটভিউ-কে বলেন, মানুষের জীবনে কি দুর্ঘটনা ঘটে না? এগুলো কি পত্রিকায় লিখতে হয়? আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।

অভিযোগ মিথ্যা হলে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- লজ্জায় আমি তো এখন প্রায় ঘরবন্দী। কী আর করার আছে আমার?

বদলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুনেছি আমাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। অফিসিয়ালি এখনও আদেশ পাইনি।

রুমেনার বিষয়ে এসএমপি’র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) সন্ধ্যায় সিলেটভিউ-কে বলেন, প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে রুমেনার চাকরি নেওয়ার বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

তিনি বলেন, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের গত ২৮ ফেব্রুয়ারির এক আদেশের ভিত্তিতে রুমেনাকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে বদলি করা হয়েছে।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম