সামরিক অভিযান শুরুর ১৭তম দিনে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে রুশ বাহিনী। রাজধানীর আশপাশের শহরগুলোয় বেড়েছে যুদ্ধের তীব্রতা। এর মধ্যে মানবিক করিডর দিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজধানীর কাছের ইরপিন ও বুচা শহরে আরো আগে থেকেই চলছে রাশিয়ার বোমাবর্ষণ।
স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার সকালে ভাসিলকিভ শহরের এক বিমানবন্দরেও হামলা হয়। অন্য শহরগুলো এরই মধ্যে হয় রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, নয়তো সেগুলোয় লড়াই চলছে।
একদিকে রুশ বাহিনী এগোচ্ছে, অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য রাজধানীকে দুর্গে পরিণত করছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। নগরের মেয়র ভিতালি ক্লিশকো জানান, যুদ্ধের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় নানা উপায়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি খাদ্য ও ওষুধের মজুদ নিশ্চিত করা হচ্ছে। রাজধানীকে এরই মধ্যে ‘অবরুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলিয়াক।
এসবের মধ্যেই চলছে বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ। খাদ্য ও ওষুধ বহনকারী গাড়িগুলোয় করে তাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। রাশিয়ার অব্যাহত বোমাবর্ষণের কারণে কাজটি কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করে কিয়েভ কর্তৃপক্ষ।
মারিওপোলের পরিস্থিতি সম্পর্কে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা বলেন, সেখানে ‘এ গ্রহের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ ঘটেছে। ১২ দিনে সেখানে দেড় হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।
মারিওপোল শহরেই গতকাল আরো বোমা পড়ে। স্থানীয় যে মসজিদে ৮০ জন সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল, বোমা পড়ে সেখানেও—এমনটা জানায় কিয়েভ। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষ বলছে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বোমা পড়লেও মসজিদ অক্ষত আছে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলীয় মাইকোলাইভ শহরে এক হাসপাতাল হামলার শিকার হয়েছে বলে জানায় এএফপি।
ম্যাখোঁ ও শোলজের অস্ত্রবিরতির আহ্বান : রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গতকাল ফোনে কথা বলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাখোঁ ও জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ।
এই দুই ইউরোপীয় নেতা ইউক্রেনে অবিলম্বে অস্ত্রবিরতি কার্যকরে রাজি হওয়ার আহ্বান জানান। ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গতকাল পুতিনের সঙ্গে কথা হয় বলেও জানান ওই দুই নেতা। পুতিনের সঙ্গে কথা বলার আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গেও শোলজ কথা বলেন।
এদিকে ফ্রান্সের এক সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন যুদ্ধ শেষ করতে এখনো প্রস্তুত নন বলে মনে হচ্ছে।
‘অস্ত্রবিরতি হলে তবেই শান্তি আলোচনা’ : বিশ্বনেতাদের কথোপকথনের পর গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেন ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধান জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ‘আমাদের কূটনীতিকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্ভাব্য অ্যাজেন্ডা নিয়ে তাঁরা কথা বলেছেন। আমি এর বাস্তবায়ন চাই এবং যুদ্ধের ইতি টানার প্রক্রিয়া, শান্তির প্রক্রিয়া অবশ্যই শুরু হতে হবে অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে। ’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, গত শুক্রবার ৫০০ থেকে ৬০০ রুশ সেনা ইউক্রেনীয় সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তবে এ দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিক যাচাই করা যায়নি বলে জানায় বিবিসি।
ইউক্রেনমুখী মার্কিন অস্ত্রবহরে হামলার হুমকি : রাশিয়ার ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশ থেকে ইউক্রেনে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র পাঠাচ্ছে। ইউক্রেনে পাঠানো ওই সব অস্ত্রের বহর রাশিয়ার হামলার ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ বলে মন্তব্য করেন রিয়াবকভ।
বিতণ্ডায় শেষ হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক : যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে জীবাণু অস্ত্র তৈরির কাজ চালাচ্ছে, রাশিয়ার এমন অভিযোগ নিয়ে গত শুক্রবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক হয়। কোনো প্রমাণ নেই মন্তব্য করে রাশিয়ার অভিযোগ নাকচ করে দেয় জাতিসংঘ।
আর জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত লিন্ডা টমাস-গ্রিনফিল্ড বলেন, কভিড-১৯ ও এ ধরনের বিভিন্ন রোগ শনাক্তে কাজ করে, ইউক্রেনের এমন জনস্বাস্থ্য খাতে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে জীবাণু অস্ত্র তৈরির কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি আরো বলেন, রাশিয়া নিজেই হয়তো ইউক্রেনে রাসায়নিক হামলা চালাবে এবং এ জন্যই তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ড ঢাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে রাশিয়া এর আগেও এ ধরনের মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন মার্কিন দূত লিন্ডা।
এসবের মধ্যে গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সিএনএনকে বলেন, ‘আমার কাছে যে গোয়েন্দা তথ্য আছে, সে বিষয়ে কিছু বলব না। কিন্তু রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার করলে রাশিয়াকে সত্যিই চড়া মূল্য দিতে হবে। ’
মেলিতপোলের মেয়রকে ধরে নিয়ে গেছে রুশ সেনারা : রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মেলিতপোলের মেয়রকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার রুশ বাহিনী শহরটির মেয়র ইভান ফেদরোভকে ধরে নিয়ে যায় বলে জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। মেয়রকে অপহরণের জন্য রুশদের লজ্জিত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/জিএসি-১৮
সূত্র : এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা।




