রামাদানুল মোবারক এক মহিমান্বিত মাস। এ মাস আসে শান্তির বার্তা নিয়ে। ফুরফুরে মেজাজে প্রশান্ত মন নিয়ে ইবাদাতে লিপ্ত থাকার মাস রামাদান। রামাদানে সাহরী ও ইফতারের গুরুত্ব অনেক।

যে কাউকে ইফতার করানোতে রোজাদারের সমান পাওয়া যায়। হয়তো এ হাদিস সামনে রেখে এবং বিবাহিত মেয়েটা নিজের সাথে নেই তাই তাকে এবং তার ওসিলায় তার পরিবারের সবাইকে ইফতার করানোর রেওয়াজ চালু হয়৷


মেয়েটা নিজের সাথে ইফতার করছে না আর তাকে বাড়িতেও আনা যায় না। আনলেও তার বাড়িতে গিয়ে আনতে হয়৷ মেহমান বাড়িতে গেলে কিছু নিতে হয়। রামাদান মাসে যা কিছু নেয়া হোক খাওয়া হবে ইফতারের সময় অথবা আরো পরে। মেহমানের মিষ্টি আর মেয়ের ইফতারী একসাথে হয়ে গেল।

ভালোভাবে কিছু নিতে পারলে সম্পর্ক ও সম্মান বাড়ল৷ মেয়ের মুখ উজ্জ্বল হবে এমন ভাবনা থেকেই ইফিতারির প্রচলন। প্রথমে সাধ্য অনুযায়ী কিছু নিয়ে যাওয়া। পরে এক সময় অপরপক্ষ এটাকে নিজেদের অধিকার মনে করা এবং দু'চারটা আইটেম দাবি করা।

আস্তে আস্তে এর সাথে নিজের সামাজিক অস্তিত্ব ও সম্মানের দোহাই লেগে যাওয়া।

দাবি করে বসা , বউকে শুনিয়ে বলা আমাদের এলাকায় এরকম এরকম রেওয়াজ।ক্ষেত্রবিশেষে খোঁটা দেয়া। বকবকানি করা এমনকি এ নিয়ে ঝগড়া পর্যন্ত হতে থাকা। এভাবেই একটা সময়ে স্বাভাবিকভাবে সওয়াবের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হওয়া ইফতারিকে বর্তমানে জুলুমের পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

ইফাতারি দেয়ার জন্য বাড়ির গাছ বিক্রি করা, প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করা, গরু ছাগল বিক্রি এমনকি নিজের কাছে টাকা না থাকায় অল্প টাকা কোম সুদী প্রতিষ্ঠান থেকে অল্প টাকা (১০ হাজার) সুদ নিতেও দেখেছি। কোন উপায়ান্তর না দেখে শেষমেশ সুদের দ্বারস্থ হন অনেকেই৷ কিছু টাকা ইফতারি দিয়ে আর কিছু টাকা দিয়ে ছোটখাটো কিছু একটা করে ঋণ মারার চিন্তা থেকেই সুদ নেন।

নাহ! বিষয়টি এখানেও থেমে নেই। আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে অনেকে পরিচিত ধনীদের নিকটা হাত পাতেন মেয়ের বাড়িতে ইফতারি দেয়ার জন্য। কেউ কেউ তাচ্ছিল্যের স্বীকার ও হোন । এমনকি ভিখারিরাও মেয়ের বাড়িতে ইফতারি না দিলে মেয়ের কষ্ট হবে, মুখ পুড়বে বলে টাকা খুজতে শোনা যায়। বাস্তবে এ করুণ দৃশ্য দেখার পর চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না। কিন্তু কিছু করার থাকে না।।

ইফতার করানোতে সওয়াব আছে৷ তাই বলে মেয়ের বাড়িতে বয়ে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতে হবে? আর এমন সওয়াব থেকে ছেলেপক্ষ বঞ্চিত থাকবেন কেন? তারাও তো মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠাতে পারেন।

আর ইফতার বয়ে নিয়ে খাওয়াতে হবে কেন? দাওয়াত দিলে মেহমান মেজবানের বাড়িতে এসে ইফতার করবেন৷ আপনার সাধ্য থাকলে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে তাওফিক অনুযায়ী কিছু মানুষকে ইফতার করান তাতে বাধা দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু যখনি এটা সামাজিক নিয়ম এবং সম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখন সেটাকে নিয়ে চিন্তা করতেই হয়। অনেক সময় বর পক্ষের কথা থাকে আমাদের একটা সামাজিক অবস্থান আছে সে হিসেব করে দিতে হবে। আমরা আবার ভালো ছাড়া সাধারণ কিছু খাওয়াই না৷ যাতে সম্মান রক্ষা হয় এমন চিন্তা করবেন। বাহ!কার টাকা দিয়ে কার ফুটানি। কি ভদ্রতা?


অঞ্চলভেদে মেয়ে,ভাতিজী,ভাগ্নীর বাড়ি এমনকি বিয়ের উকিল বাবা হলে সেই মেয়ের বাড়িতেও ইফতার পাঠাতে হয়৷ না দিতে পারলে লজ্জার ব্যাপার হিসাবে ধরা হয়। অথচ উকিল বাবা ব্যাপারটাই কুসংস্কার৷ শরীয়াতে এরকম উকিল বাবার কোন অস্তিত্বই নেই। বিয়ের উকিলকে বাবা ডাকতে হবে বা বাবার মত মানতে হবে এরকম কোন বিধান নেই।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা সংস্থা/সংগঠন কতৃক আয়োজিত ইফতার মাহফিলের অভাব নেই৷ অনেক পরিচিত মানুষ বাড়িতে প্রথমদিকে ইফতার করতে পারলেও পরে দাওয়াত রক্ষা করতেই হিমসিম খেতে হয়। সময়ের তালে আধুনিকতার প্রভাবে ইফতার মাহফিল এখন হয়ে গেছে ইফতার পার্টি৷

এতে সওয়াবের নিয়ত থেকেও সামাজিক অবস্থান ও সম্মানের চিন্তা থাকে বেশি। বেশীরভাগ মাহফিলের আয়োজন করা হয় অমুক দল বা সংগঠন ইফতার পার্টি করছে আমাদেরও করতে হবে এমন চিন্তা থেকে। এতে নিয়তের পরিশুদ্ধতা থেকে লৌকিকতা ও বড়ত্ব'র ছায়া বেশি থাকে। যেন এটা সামাজিক সাধারণ কোন ব্যাপার। অন্যরা করছে তাই আমাদেরও করতে হবে। অথচ ইফতার করানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে নিয়তের পরিশুদ্ধতা থাকা পূর্বশর্ত।

শেষ করছি এ কথা বলে, সওয়াবের উদ্দেশ্যেও যদি আপনার মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠান তাহলে শুধু মেয়ের পরিবারের মানুষ সংখ্যা হিসাব করে ইফতার না দিয়ে গ্রামের সবার জন্য পাঠাতে হবে কেন? এমন একটা নফল ব্যাপার যা গরীব ও মধ্যভিত্তের জন্য বোঝা, ঋণ এবং দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে তা কি বাদ দেয়া উত্তম নয়?

তাই, ফেতনা না বাড়িয়ে আমরা আস্তে আস্তে লৌকিকতা, ও সামাজিকতার নামে জুলুম বন্ধ করি।