আজ রবিবার (৫ জুন) যুক্তরাজ্যের বাকিংহামে কমনওয়েলথ গেমসের মশাল রিলে অনুষ্ঠিত হবে। সেই রিলেতে ব্রিটেনের রাণীর পক্ষে মশাল বহন করবেন সিলেটের মেয়ে ইয়াসমিন হুসেন।
যুক্তরাজ্যে দেশের মশাল হয়ে নিজের আলোয় প্রজ্জ্বলিত থাকা ইয়াসমিনের পৈত্রিক বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে। ব্রিটেনে অনুপ্রেরণাদায়ক দুই হাজার মানুষের তালিকা থেকে নয় জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের বাঙালি কমিউনিটির মেয়েদের মধ্যে ফুটবল ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন ইয়াসমিন। ২০২১ সালে তিনি পেয়েছেন কমিউনিটি হিরো ক্যাটাগরিতে বিটি স্পোর্টস উইমেন্স অ্যাওয়ার্ড।
এবার কমনওয়েল গেমসের আসর বসছে যুক্তরাজ্যে। আগামী ২৫ জুলাই থেকে শুরু হবে ঝমকালো এ আসর। তার আগে রবিবার যুক্তরাজ্যের বাকিংহামে কমনওয়েলথের মশাল রিলে অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৮ আগস্ট আসরটির পর্দা নামবে।
'দৈনিক সিলেট মিরর'-কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ইয়াসমিন তাঁর জীবনের গল্প বলতে গিয়ে জানান- স্কুলে থাকার সময় ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর তীব্র আকর্ষণ। ফুটবলারই হতে চেয়েছিলেন। খেলতেন ছেলেদের সঙ্গে। কিন্তু একটা সময় পরিবার থেকে আসলো বাঁধা। থেমে গেল ফুটবলার হয়ে উঠার স্বপ্ন। তবে ইয়াসমিনের একেবারেই থেমে যাননি। দেড় যুগ পর আবারও তিনি ফিরলেন ফুটবলে। তবে ভিন্নভাবে।
তিনি বলেন, ‘একদিন বাবা ডেকে বললেন তুমি বড় হয়ে যাচ্ছ। এখন শুধু ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলাটা ঠিক হবে না। অনেকে এটা ভালো চোখে দেখবে না। এখন বাদ দিয়ে দাও। কিন্তু আমি তো ফুটবল উপভোগ করতাম।’ বাঁধা দিলেও আগ্রহ দেখে বাবা আরেকটা সুযোগ দিয়েছিলেন তাকে। সে কথা জানিয়ে ইয়াসমিন বলেন, ‘বাবা বললেন তুমি যদি এমন জায়গা পাও যেখানে মেয়েরা খেলে তাহলে খেলতে পারো।’
জানা যায়, বাবার পরামর্শ অনুযায়ী ইয়াসমিন নেমে পড়েন মেয়েদের ফুটবল দল বা মেয়ে কোচের সন্ধানে। কিছুদিন খোঁজাখুজির পর তিনি আবিস্কার করেন, এমন কিছু তার এলাকায় তো নেই-ই আশেপাশের এলাকাতেও নেই। অগত্যা হতাশ হয়ে তিনি হাল ছেড়ে দেন। অনিচ্ছায় ফুটবলকে বিদায় বললেও মাঠের টান তার ছিল। ফুটবল ছেড়ে তখন স্কুলে নেট বল খেলতেন। সেখানে মেয়েদের দল ছিল, কোচও নারী তাই বাবার আপত্তি ছিল না।
একটা সময় বিয়ে হয়ে যায়। বাবার বাড়ি ম্যানচেস্টার ছেড়ে চলে আসেন লন্ডনে। সংসার বড় হয়। বাচ্চাদের লালন পালনে মন দেন তিনি। ততদিনে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু বাচ্চারা বড় হওয়ার পর হঠাৎ একসময় তাঁর মধ্যে শূন্যতাবোধ হতে থাকে। নিজেকে কিছুটা একা লাগে। ভালো লাগত না। এক সময় মনে হলো নিজের জন্য কিছু একটা করতে চান তিনি। এমন কিছু করতে চান যা তিনি উপভোগ করেন। এমন ভাবতেই প্রথমেই মাথায় আসে-‘ফুটবল’। সেটা ২০১৭ সালের কথা।
ইয়াসমিন বলেন, ‘চিন্তাটা মাথায় আসতেই কাজে লেগে যাই। ইন্টারনেট ঘেটে দেখি মেয়েদের জন্য ফুটবল আছে কিনা কোথাও। ফেসবুকে সার্চ করলাম- ‘লেডিস ইনডোর ফুটবল’ লিখে। পেয়েও যাই।’ ফুটবল খেলার চিন্তা থেকে ঢুকেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিন্তু তাদের সাইডে দেখলাম একটা বিজ্ঞাপন- নারী ফুটবল কোচ খুঁজছে তারা। সেখানে নারী কোচ বিশেষ করে মুসলমান কোচ তৈরিতে তারা খুব উৎসাহ দিচ্ছিল। সেদেশে সাধারণত যেটা করে না- নামাজের বিরতিরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। আমি সেখানে আবেদনের সিদ্ধান্ত নিলাম।’
নিজের এমন চিন্তার কথা স্বামীর সঙ্গে শেয়ার করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাকে বললাম আমি নারী কোচের কোর্স করে সেটা কাজে লাগাতে চাচ্ছি, তুমি কি আমাকে সমর্থন দেবে? তিনি আমাকে বললেন, তোমার কাছে যদি বিষয়টি উপভোগ্য হয় তাহলে তুমি করতে পারো।’ আমি তাকে বললাম, ‘আমার তো খুব ইচ্ছে ছিল- কিন্তু আমি পারিনি। আমাদের বাচ্চারা বা এই প্রজন্ম যাতে আমার মতো অবস্থায় না পড়ে সেজন্য কাজটা করতে চাই। তিনি সম্মতি দিয়ে দিলেন।’
নিজের মেয়েদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে ছিল। তাদের কারাতে শিখতে পাঠিয়েছিলাম। তারা একটা সময় বলল, আম্মা আমরা আর খেলতে চাই না। কারণ সেখানে শুধু ছেলে আর ছেলে। আমি তখন নতুন করে উপলব্ধি করি আমাদের কমিউনিটির জন্য নারী ক্ষেত্র তৈরি করাটা খুব জরুরি। এসব কারণ আমাকে কোচ হতে আরো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে।’
কোচের কোর্স শেষ করেই সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসমিন একটি ক্লাবে যোগ দেন। সে সময়ের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি এমএসএইর সঙ্গে কাজ শুরু করি। মসলেমাস স্পোর্টস অ্যাসোসিয়শনে আমি ইনডোর ফুটবল খেলতাম। পরে আউটডোর ফুটবল শেখানোর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য যাই ফ্রেম ফেড ক্লাবে। সেখানে প্রথমে ছেলেদের কোচিং করাই।’ সেখানে কোনো মেয়ে ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার তখন ভাবনা ছিল আমি তো ছেলেদের শেখাতে আসিনি আমার লক্ষ্য ছিল মেয়েদের ফুটবল শেখানো। আমি এমএসএইর সঙ্গে পার্টনারশীপে ফেড ক্লাবে মেয়েদের দল গড়ে তোলার কাজে হাত দেই। এখন আমার ক্লাবে ৮০ জন মেয়ে ফুটবল খেলে। তাদের বয়স ৭ থেকে ৩৭ বছর পর্যন্ত।’ এখন দারুণ সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে বলেন, ‘গত ছয় মাসে আমি আমাদের কমিউনিটিতে ৩০ নারী কোচ তৈরি করেছি প্রশিক্ষণ দিয়ে। এদের বয়স ১৬ থেকে ৪২ বছরের মধ্যে।’
শুধু ক্লাব কেন্দ্রীক পরিবেশ তৈরি করে থেমে থাকেননি ইয়াসমিন। পুরো ইংল্যান্ডে নারী ফুটবলকে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। এখন এমএসআইয়ের সঙ্গে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন। স্কুলগুলোতে মেয়েদের ফুটবল দল তৈরি সে প্রকল্পের কাজ।
তিনি বলেন, ‘আমি সপ্তাহে একদিন স্কুলগুলোতে যাই মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেই, শিক্ষকদের সমর্থন দেই। এমএসআইয়ের সঙ্গে নতুন কাজ শুরুর পর বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছি। মুসলমান কমিউনিটিকে আমার গল্প দিয়ে উদ্ভুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। মেয়েদের বলি তোমরা আসো আমাদের সমর্থন করো। এখন আমাদের কমিউনিটিগুলোতেও নারী কোচ তৈরি হচ্ছে।’
ইয়াসমিন বলেন, ‘আমি বিভিন্ন প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুলে যাই। সেখানে শিক্ষকদের কোচিং প্রশিক্ষণ দেই। কারণ আমাদের এখানে স্কুলগুলোতে ছেলেদের ফুটবল খেলা চালু আছে, মেয়েদের নাই। আমার লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিটি স্কুলে মেয়েদের ফুটবল শুরু করা। এ লক্ষ্যে আমি এমএসএইর সঙ্গে প্রজেক্টের কাজ করছি। প্রতিটি স্কুলে ছয় সপ্তাহ করে প্রশিক্ষণ দেই। এরপর আমি চলে আসলেও তাদের শিক্ষক সেটা চালিয়ে যান।’
উল্লেখ্য, এবার কমনওয়েল গেমসের আসর বসছে যুক্তরাজ্যে। আগামী ২৫ জুলাই থেকে শুরু হবে বৈশ্বয়িক এ ঝমকালো আসর। এ উপলক্ষে আজ রবিবার যুক্তরাজ্যের বাকিংহামে কমনওয়েলথের মশাল রিলে অনুষ্ঠিত হবে। আসরটির পর্দা নামবে আগামী ৮ আগস্ট।
আজকের রিলেতে ইংল্যান্ডের রাণীর পক্ষে কমনওয়েলথের মশাল বহন করবেন ইয়াসমিন হুসেন। তার এই অর্জন বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আলাদা আনন্দ যোগ করেছে। তবে এই মশাল বহনের জন্য নির্বাচিত হওয়াও বেশ প্রতিযোগিতামূলক। যুক্তরাজ্যে অনুপ্রেরণাদায়ক ২ হাজার মানুষের মধ্যে থেকে মাত্র নয় জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। যাদের একজন ইয়াসমিন হুসেন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে সে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন, রেডিও, ও সংবাদমাধ্যমে নিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাকে আলাদা পরিচিত দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাকে পরিচয় করে দেওয়া হয়েছে ‘ফেস অব দ্য বাটিমব্যারা’ হিসেবে। গার্ডিয়ানের মতো পত্রিকা তাকে নিয়ে করেছে কাভার স্টোরি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




