গত ২৪ মে মঙ্গলবার আবার রক্তাক্ত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গন। সালভাদর রামোস নামের এক তরুণ তার ১৮তম জন্মদিনে উপহার পাওয়া আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে একে একে হত্যা করলেন ১৯ শিশু আর দুই শিক্ষককে। মেক্সিকো সীমান্ত থেকে ঘণ্টাখানেক দূরত্বের একটি ছোট্ট জনপদ টেক্সাসের ইউভালডে শহরের রব এলিমেন্টারি স্কুলে হামলা চালান বন্দুকধারী রামোস। স্কুলে গোলাগুলি শুরুর পর বর্ডার প্যাট্রলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এরপর তাদের ছোড়া গুলিতে হামলাকারী তরুণ নিহত হন। অর্থাৎ আরো একটি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্দুকধারীর হামলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। বিবিসি ও এএফপি সূত্রে পাওয়া খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবারের এই ঘটনার ঠিক দিন দশেক আগে নিউইয়র্কের বাফেলোতে একটি সুপারশপে বন্দুকধারীর হামলার ঘটনায় মারা যায় ১০ জন। ২০১২ সালে কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে এ রকম একটি বন্দুক হামলায় ২০ শিশু ও আরও ছয়জন নিহত হয়। গত বছর এমন ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ বার ঘটেছে। ২০২০ সালে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে বন্দুকসংশ্লিষ্ট হামলা সড়ক দুর্ঘটনাকে ছাপিয়ে সবার ওপরে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এলিমেন্টারি স্কুলে বন্দুক হামলার পর পরই কানাডার টরন্টোয় স্কুলের কাছে পুলিশের গুলিতে এক বন্দুকধারী নিহত হয়েছেন।
উন্নত মানবাধিকারের দেশ বলে পরিচিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এ ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পর আবার আলোচনায় এসেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি।
যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্টে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। বেশকিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরে তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এসব বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে জড়িত।
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দফতর আলাদাভাবে এই নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান আইজিপিও রয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দ্বারা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দ্বারা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড। সেখানে ২০২০ সালের ১ জুন প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে পুলিশের গুলিতে ৭ হাজার ৬৬৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে পুলিশের গুলিতে এক হাজার ১০৬ জন, ২০১৪ সালে এক হাজার ৫০ জন, ২০১৫ সালে এক হাজার ১০৩ জন, ২০১৬ সালে এক হাজার ৭১ জন, ২০১৭ সালে এক হাজার ৯৫ জন, ২০১৮ সালে এক হাজার ১৪৩ জন এবং ২০১৯ সালে এক হাজার ৯৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মধ্যে ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ এক হাজার ১৪৩ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। আর ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে বছরে গড় প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় এক হাজার ১০০ জন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কমপক্ষে এক হাজার ২০০ জনেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশের গুলিতে হতাহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু অথবা অন্য পদ্ধতিতে নিহত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক অসম হারে পুলিশের গুলিতে নিহত বা আহত হয়েছেন, যা একইভাবে হতাহত শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি।
২০১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা টানা চার বছর ধরে এক হাজারের আশপাশেই রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে পুলিশের গুলিতে ৯৯৮ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৯৮৭। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে নিহত মানুষের সংখ্যা ৯৬৩ জন এবং ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৯৫ জন।
অন্যদিকে অ্যাসোসিয়েট প্রেস-এপি, ইউএসএ টুডে এবং নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি যৌথ জরিপের তথ্য বলছে, যেকোনো বছরের তুলনায় ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি ম্যাস কিলিং বা গণহারে হত্যার ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৯৯৬টি। ৯৬% হত্যাকাণ্ড ঘটেছে পুলিশের গুলিতে। নিহতদের ২৭% আফ্রিকান-আমেরিকান, যদিও তারা মোট জনসংখ্যার ১৩%। মানবাধিকার প্রতিবেদন অনুসারে ৯৮.৮% ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অথচ এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ডয়চে ভেলেকে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘যেকোনো বিচার বর্হিভূত হত্যাই খারাপ। অনেক দেশেই এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। কিন্তু সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার সাহসও পাবে না।’ তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা তো তাদের হিসাবেই বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকায় আরও বেশি হয়। আমেরিকা তো তার নিজের উপরে এই ধরনের পদক্ষেপ নেয় না।’ তার মতে, ‘বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যা একটাও গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এটা আমেরিকার মাধ্যমে জানতে হবে না।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপে বাংলাদেশ চিন্তিত হবে, এখন আর সেই অবস্থা নেই বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
আমরা আরেকটু পেছনের দিকে তাকাই। ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এর কালো রাতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। নয় মাসে ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছিলেন। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট নৃশংসতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো, ৩রা নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো। সাম্প্রতিক সময়ে আসা যাক। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সহস্রাধিক। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ২১শে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা এবং শাহ এএমএস কিবরিয়া ও আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অগণিত রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকারের চোখ তখন কোথায় ছিল? তখন তো গণতন্ত্রের কোনো সংকট খুঁজে পায়নি তারা!
মানবাধিকারের ধ্বজাধারীদের কাছে প্রশ্ন, র্যাব মানবাধিকার লুণ্ঠন করে, নাকি মানবাধিকার রক্ষা করে? র্যাব যে কাজটি করছে সেটা সঠিক না ভুল, তার তদন্ত হয়। বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ৯ হাজার সদস্যের এই ফোর্সটির ২৮ জনকে জীবন দিতে হয়েছে। এক হাজার সদস্যের জখম, অঙ্গহানি হয়েছে। দুই হাজারের বেশি সদস্য আহত হয়েছেন। র্যাবের অনেক কাজ অনেক দেশের জন্যই রোল মডেল। এই বাহিনী বাংলাদেশে জঙ্গিদের অবস্থান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এসব অর্জন তো মানবাধিকারের কথিত এই ধারক-বাহকদের চোখে পড়ে না।
তাদের মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মন্দার বিরুদ্ধে লড়াই করে মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে এখন বরং বলা যেতে পারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার মতো দেশগুলোকে এখন আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখা উচিত। যে চশমা পরে তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে, সেই চশমার কাঁচ বদলানোর সময় এসেছে।
লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী সাংবাদিক।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/টিএস-৬৩




