ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। দুটি ওয়্যার হাউজে সর্বসাকুল্যে আনুমানিক ২৫ কোটি টাকার মালামাল রয়েছে। অ্যামাজন কোনো সহযোগিতা করেনি। পাসওয়ার্ড না পাওয়ায় ইভ্যালির সার্ভারে ঢোকাও যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারী আনতে না পারলে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধ অসম্ভব।
বিনিয়োগকারীরা নতুনভাবে বিনিয়োগ করলে অনলাইন ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-ইভ্যালি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে জানিয়েছেন উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়া সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। শুক্রবার ধানমণ্ডিতে ইভ্যালির নিজস্ব কার্যালয়ে অডিটসহ ইভ্যালির সার্বিক অবস্থা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের একথা বলেন তিনি।
বিচারপতি মানিক জানান, ই-ভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেল ইনভেস্টর এনে প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করাতে পারবেন বলে তাদের জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, মোহাম্মদ রাসেল আমাদের বলেছেন উনি ইনভেস্টর আনতে পারবেন। যারা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবে। তারা যদি আসে, তাহলে হয়তো ইভ্যালির ব্যবসা আবার চালু হবে।
গ্রাহকরা তাদের টাকা ফেরত পাবে কিনা—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের মানিক বলেন, এটা পুরোটা নির্ভর করছে ইনভেস্টদের ওপরে। তারা ইনভেস্ট করলে ইভ্যালি চালু হবে। কিন্তু হতে পারে তার শেষ পর্যন্ত এলেন না।
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকা ইভ্যালিকে নিয়ে যে রিপোর্ট করেছিলো, সেটি সম্পূর্ণ ভুয়া। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নিজেই পরবর্তীতে আমাদের কাছে সেটা স্বীকার করেছে। ইভ্যালি চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়ানোর। হাইকোর্টের নির্দেশে আমরা অডিট কাজ শুরু করেছি। হুদা-ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড করপোরেশন ইভ্যালির টোটাল অডিটের কাজ চালাচ্ছে। জুন মাসের শেষে তারা আমাদের অডিট ফাইল জমা দেবে। আমরা সে ফাইল হাইকোর্টে জমা দেব। তারপর হাইকোর্ট আইনগত সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি আরও বলেন, ইভ্যালির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এখন যে টাকা আছে, সেটা দিয়ে পুরো পাওনা শোধ করা অসম্ভব। এছাড়া, পাসওয়ার্ড ক্লেইম করাসহ সার্ভার চালু করতে না পারলে কোনোপ্রকার তথ্য আমরা জানতে পারছি না। যা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে দিচ্ছে।
ইভ্যালির চারটা ওয়্যারহাউজে এখনো ২৫ কোটি টাকার পণ্য আছে জানিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান বলেন, শেষ পর্যন্ত যদি ইনভেস্টর না আসে, সেক্ষেত্রে আমাদের হাইকোর্টের নির্দেশ নিয়ে পণ্যগুলো বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা মেটাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইভ্যালির দুই ধরনের পাওনাদার রয়েছে। যারা সাপ্লাইয়ার আর যারা ক্লায়েন্ট। এখানে সাপ্লায়ারদের পাওনা বেশি। বর্তমানে ইভ্যালির যে সম্পদ রয়েছে তাতে পাওনাদারদের সন্তুষ্ট করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে গ্রাহক পুরো টাকাটা পাবেন না। ১ লাখ টাকার জায়গায় ২৫ হাজার টাকা পাবেন।
‘ঢাকার সাভারে ইভ্যালির দুটি ওয়্যার হাউজে সর্বসাকুল্যে আনুমানিক ২৫ কোটি টাকার পণ্য রয়েছে। এছাড়া নয়টা ছোট পুরাতন কাভার্ডভ্যান ও ৫টা গাড়ি পেয়েছি। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। যা পাওনাদারদের টাকার তুলনায় কিছুই না, এটা সমুদ্রের মতো পাওনাদের টাকা পরিশোধ অনেকটা এক ফোঁটা পানির মতো অবস্থা’—যোগ করেন সাবেক বিচারপতি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ রেজাউল আহসান, ইভ্যালির এমডি মাহবুব কবির মিলন, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফখরুদ্দিন আহম্মেদ, লিগ্যাল অ্যাডভাইজার আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ।
ইভ্যালির সার্ভারের এক্সেস না থাকায় দেনা-পাওনা ও লেনদেনের সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছেনা উল্লেখ করে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আমরা ইভ্যালির সার্ভারটি অপারেট করার অনেক ধরনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এটির পাসওয়ার্ড আমাদের কাছে নেই। পাসওয়ার্ড জানতে আদালতের অনুমতি নিয়ে আমরা জেলে গিয়ে রাসেলের সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনি লিখিত দিয়েছেন, ‘পাসওয়ার্ডটি তার মনে নেই। এটি তার ডেস্কের ড্রয়ারে একটি কালো ডায়েরিতে রাখা।’
এরপর আমরা দেশের এটুআই, সিআইডিসহ একাধিক আইটি এক্সপার্টদের সঙ্গে বসে পাসওয়ার্ডটি উদ্ধারের চেষ্টা করেছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। সার্ভারটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা অ্যামাজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা শুধু একটি কথাই বলেছে ‘পাসওয়ার্ড ছাড়া কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়।’
ইভ্যালির বর্তমান এমডি মাহবুব কবীর মিলন এ বিষয়ে বলেন, আমরা ইভ্যালির আইটি প্রধান তানভিরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সে আমাদের বলেছে, রাসেল গ্রেপ্তারের আরও দু'মাস আগে সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, তখন আইডি পাসওয়ার্ড সব রাসেলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। পরে তার আগের পাসওয়ার্ড দিয়ে চেষ্টা করে দেখেছে এক্সেস সম্ভব হয়নি, তারমানে রাসেল পরে আবার পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করেছে। তানভিরের অধীনে যারা কাজ করতেন তারাও পাসওয়ার্ডের বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি।
গেটওয়েতে আটকে থাকা অর্থের বিষয়ে জানতে চাইলে এমডি মাহবুব কবীর মিলন বলেন, ইভ্যালির ৬টি গেটওয়েতে সব লেনদেন হয়েছে। আমরা সেসব গেটওয়ের আটকে থাকা অর্থ গ্রাহকদের ফেরতের কথা আলোচনা করছিলাম। কিন্তু তারা বলেছে, ইভ্যালির কাছ থেকে পাওনার বিষয়ে লিখিত নিয়ে এলে যে নির্ধারিত ওই গ্রাহকের পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয়নি, তাহলে আমরা অর্থ ব্যাক করতে পারবো।
কিন্তু সার্ভারের এক্সেস না থাকায় এটাও সম্ভব হচ্ছে না। কে পণ্য কিনেছে, কার পণ্য ডেলিভারি হয়নি এটা জানা সম্ভব হচ্ছে না। যতোক্ষণ পর্যন্ত সার্ভার সচল না হবে ততোক্ষণ ওই ২৫ কোটি টাকা গেটওয়েতে আটকে থাকবে। একইভাবে সার্ভার সচল না হলে পণ্য থাকলেও কোনো গ্রাহককে পণ্য দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সে পণ্য পেয়েছে কি-না বা আদৌ পাবে কি-না জানা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আরিফ বাকের নামের এক গ্রাহক গুলশান থানায় মো. রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরদিন বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র্যাব।
গত ২১ এপ্রিল চেক প্রতারণার ৯ মামলায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাসেলকে জামিন দেন আদালত। ওই দিন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পান তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে আরও মামলা থাকায় কারামুক্ত হতে পারেননি রাসেল। শামীমা নাসরিন বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
পরে গত বছরের ১৮ অক্টোবর ইভ্যালি পরিচালনার জন্য আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করে দেন হাইকোর্ট।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিডি
সূত্র : ঢাকাটাইমস




