একটি বাঁধ, রক্ষা করেছিল ঢালারপাড়কে। যার নাম কালা পাথর বাঁধ। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে সংগৃহীত বিশেষ কালা রংয়ের পাথর দিয়ে নির্মিত হওয়ায় এই বাঁধকে কালা পাথর বাঁধ বলা হতো। ১৯৯৩ সালে নির্মিত হয় এই বাঁধ। তখনকার সময়ের ৩০ লক্ষ টাকা ব্যায়ে নির্মাণ এই বাঁধের দৈর্ঘ ছিল ৫ শত মিটার। বাঁধটি নির্মাণের জন্য এলাকাবাসী অনেক মিটিং মিছিল করতে হয়েছে। এই বাঁধের জন্য মানুষ জেলও খেটেছে। বালু খেকুদের কবলে পড়ে এখন অতীত হয়ে গেছে ঢালারপাড় রক্ষাকারী এই বাঁধ। এতে ভাঙ্গনের হুমকির মুখে পড়েছে ঢালারপাড় গ্রাম। বাঁধ থেকে বালু উত্তোলনে বাঁধা দেওয়ায় একজন মহিলাকে মারধর করেছে বালু খেকুরা। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হলেও প্রশাসনের নেই কোন তৎপরতা। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ দিলেও তাতে মন গলাতে পারেননি তারা। কোন এক অদৃশ্য কারণে নিরব প্রশাসন। প্রতিদিন পুলিশের ২টি টহল টিম সেখানে পাহারা দেওয়ার কথা। যাতে কেউ লিজ বহির্ভুত জায়গা থেকে বালু উত্তোলন করতে না পারে। লিজ বহির্ভুত জায়গা থেকে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান থাকার কথা সেই পুলিশের পাহারায়ই বৈধ হচ্ছে এসব বালু উত্তোলন।

গত বৃহস্পতিবার উত্তর রাজনগর গ্রামের নয়ন বানু বাধা দিয়ে ছিলেন লিজ বহির্ভুত কালা পাথরের বাঁধ থেকে বালু-পাথর উত্তোলন করতে। বাঁধ বিলিয়ন করার পরও সেখান থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকার ফলে হুমকির মুখে পড়েছে নয়ন বানুর বসতভিটা। তাই অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দিয়ে ছিলেন তিনি। সে সময় বালু খেকুরা তাকে মারধর করে। নয়ন বানু সেখানেই জ্ঞান হারালে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে।


নয়ন বানু জানান, আমার বাড়ি নদীর পাড় ঘেঁষা। কালা পাথরের বাঁধ বিলীন করার পর এখন আমার বাড়ির পাশ থেকে বালু উত্তোলন করতে শুরু করেছে বালু খেকু চক্র। আমি সেখানে বাধা দিলে তারা আমাকে মারধর করে আহত করেছে। আমি কারো কাছ থেকে কোন বিচার পাচ্ছি না। এখন আমার বসতভিটা বিলীন হওয়ার পথে।

একই গ্রামের শাহেনা বেগম জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন করার কারণে হুমকির মুখে আমার বাড়ি। যে কোন সময় বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আমরা বাধা দিতে গেলে বালু খেকুরা ভয়ভীতি দেখিয়ে বলে সেখানে তারা পুকুর করবে কারো আটকানোর ক্ষমতা নাই।

১৯৯২-৯৩ সালে তৎকালীন সিলেট-১ আসনের এমপি খন্দকার আব্দুল মালিক এই বাধঁটি নির্মানের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিলেন। মূলত বৃহত্তর ঢালারপাড় রক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছিল এই বাঁধ। বাধঁটি নির্মাণের পর ঐ এলাকা আর ভাঙ্গনের কবলে পড়েনি। বাঁধটিকে ঘিরে একটি রাস্তাও নির্মাণ করা হয়। যেটি রাজনগর ও ঢালারপাড়কে সংযুক্ত করেছে। বালু খেকুরা অবৈধ ভাবে কালা পাথরের বাঁধ ভেঙ্গে বালু ও পাথর নিয়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে এই সড়কটি। সড়কের পাশ ঘেরা ঢালারপাড় গ্রাম। একটু বন্যাতেই এখন ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন এলাকাবাসী।

২০০২ সালে এই কালা পাথর বাঁধ থেকে ৪৬০ ফুট পাথর বিক্রির অপরাধ দেখিয়ে ঢালারপাড় গ্রামের মোঃ রফিকুল ইসলাম ও ইদ্রিস আলী এবং উত্তর রাজনগর গ্রামের সৈয়দ রব্বানীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলায় এক সপ্তাহ জেলও খাটেন মোঃ রফিকুল ইসলাম। দীর্ঘ ৬ বছর পর তারা মামলা থেকে মুক্তি পান। স্পর্শকাতর এই বাঁধটি থেকে দিনেদুপুরে বালু-পাথর উত্তোলন করে ধ্বংস করে দিল অবৈধ বালু খেকুরা।

কালা পাথর বাঁধের জন্য জেল খেটে আসা মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আফসোস একটি এলাকা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে বালু লুট করা হচ্ছে। যেই বাঁধের জন্য মিথ্যা মামলা সাজিয়ে আমাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল সেই কালা পাথর বাঁধ বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে বিলীন করে দেওয়া হলো। কেউ একটি প্রতিবাদও করছে না। একটু বন্যা হলেই ঢালারপাড় গ্রামের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে ধলাই নদীর বালু মহালের ইজারাদার মজির উদ্দিন বলেন, কালা পাথর লিজের বাহিরের অংশ। সেখান থেকে আমাদের কোন নৌকা বালু উত্তোলন করছে না। স্থানীয় কেউ বালু উত্তোলন করলে সেটা আমাদের দায় নায়। প্রশাসন সেটা দেখার কথা।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকান্ত চক্রবর্তীর কাছে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে মুঠফোনে জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য দিতে অপারগত প্রকাশ করেন।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/এজে